মুসলিম নারী ফাতিমা আল-ফিহরির হাতে গড়া বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর একটি প্রাচীন শহরের নাম ‘ফেজ’। এ শহরে গত সাড়ে ১১শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে একটি প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান নাম ‘ইউনিভার্সিটি অব আল কারাউইয়্যিন’ বা আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ কেউ এই একে ‘আল কারাওইন’ এবং ‘আল কারাউয়িয়্যিন’ নামেও ডেকে থাকেন।
, ২০ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৩ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ০২ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) তাজা খবর
৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমান বিশ্বের ‘প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস।
‘আল কারাউইয়্যিন’ চালু হওয়ার ২০০ বছরেরও বেশি সময় পর ১০৮৮ সালে ইতালিতে ‘বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’ কার্যক্রম শুরু করে, যা ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।
এর বছর আটেকের মাথায় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল তারও শত বছর পরে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে।
কিন্তু এগুলোর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, আল কারাউইয়্যিন নামের প্রচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, যার নাম: ফাতিমা আল-ফিহরি।
ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেসব তথ্যের বেশিরই নেয়া হয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা একটি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। ‘রাওয আল-কিরতাস’ নামের ওই বইটি লিখেছেন ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার। এটি মূলত ফেজ শহরের প্রচীন ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ।
ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের দেয়া তথ্যমতে, ফাতিমা আল-ফিহরি’র ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তার পূর্বপুরুষরা পেশায় বণিক ছিলেন। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে তাদের যাতায়াত ছিল।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এক সময় তারা তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে যান এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। ওই শহরেই আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম হয় ফাতিমা আল-ফিহরি’র।
তার পুরোনাম ছিল- ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল ফিহরি আল কুরাইশিয়া। বাবা মুহাম্মদ আল ফিহরিও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ব্যবসায় মন্দা চলার একপর্যায়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ভাগ্য ফেরানোর আশায় নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে মরক্কোয় পাড়ি জমান।
মরক্কো যাওয়ার পর ক্রমেই আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে মুহাম্মাদ আল ফিহরির। পরিবার-পরিজন নিয়ে একপর্যায়ে তিনি ফেজ শহরে স্থির হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেজ তখন ক্রমেই ওই এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আল ফিহরি রীতিমত ধনী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন।
এরপর ফেজ শহরেই একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হয় ফাতিমার। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই তার জীবনে যেন দুর্যোগ নেমে আসে। স্বামীকে হারিয়ে অল্প বয়সেই বিধবা হন ফাতিমা। কাছাকাছি সময়ে বাবা এবং ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের বিপুল সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরির নামে।
উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার পর ফাতিমা এবং তার বোন মারিয়াম সিদ্ধান্ত নেন যে, সেগুলো তারা কোনো বিলাসিতার উদ্দেশ্যে ব্যয় করবেন না। তারা স্থির করেন, সম্পদ দিয়ে এমন কিছু করবেন যা ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে কাজে আসবে।
ফেজে তখন মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। তাদের কথা মাথায় রেখে শহরে বড় মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। মারিয়াম আল-ফিহরি তার সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করে বড় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি ‘আল আন্দালুস মসজিদ’ নামে পরিচিত।
চমৎকার কারুকার্যখচিত ওই মসজিদটির আয়তন এতটাই বিশাল যে, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। অন্যদিকে, ফাতিমা আল-ফিহরিও তার ভাগের অর্থ-সম্পদ খরচ করে আরেকটি বড় মসজিদ তৈরি করেন। তবে অন্য মসজিদগুলোর তুলনায় সেটি ছিল ব্যতিক্রম। মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশায় নামাজ পড়ার জায়গার পাশাপাশি বিশাল একটি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদরাসাও রাখেন ফাতিমা।
ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরি ২৪৫ সালের (৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ) পহেলা রমজানে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরের দুই বছরের মধ্যে মসজিদের মূল ভবন তৈরি হয়ে যায়। তবে মাদরাসাসহ পুরো কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ফাতিমা তার জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরের নামের সঙ্গে মিল রেখে মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সটির নামকরণ করেন ‘আল কারাউইয়্যিন’।
বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ফেজ শহরের যে এলাকায় ফাতিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন, সেখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশই কাইরুয়ান থেকে এসে সেখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন।
সেজন্য ফেজের বাকি অংশের বাসিন্দাদের কাছে এলাকাটি পরিচিত পায় ‘কারাউইয়্যিন’ নামে, যার অর্থ ‘কাইরুয়ান থেকে আসা ব্যক্তিগণ’। সেই ধারাবাহিকতায় মসজিদ কমপ্লেক্সটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘আল কারাউইয়্যিন’।
কমপ্লেক্সটি প্রাচীন ফেজ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেখানকার মূল স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাদরাসা এবং একটি গ্রন্থাগার।
কমপ্লেক্সের একেবারে কেন্দ্রে আল কারাউইয়্যিন মসজিদের অবস্থান। সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা রাখা হয়।
মসজিদের বাইরে আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক একাডেমিক ভবন এবং ছাত্রাবাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। মারিনিড রাজবংশের শাসনামলে ১৩৫৯ সালে গ্রন্থাগারটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
এই গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের ২০ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে, যেগুলো মূলত হাতে লেখা। এর মধ্যে চার হাজারের মতো ‘দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইসলামী ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রন্থাগারটিতে ষোড়শ শতাব্দীর একটি ভল্ট রয়েছে, যেখানে একটি দুর্ভেদ্য তামার দরজা আছে। সেই দরজায় চারটি তালা রয়েছে এবং এটি খুলতে চারজন চাবিধারীর প্রয়োজন হয়। ‘দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিগুলো’ ওই নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষিত আছে।
ফাতিমার হাতে প্রতিষ্ঠিত আল কারাউইয়্যিনকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখানে জ্ঞানার্জন করতে পারতো। তবে তাদের পড়ার জায়গা ছিল পুরুষদের থেকে আলাদা। এমনকি ফাতিমা নিজেও এখানে অধ্যয়ন করতেন বলে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে মাদরাসাটি মূলত ইসলামী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিত। কিন্তু পরবর্তীতে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, সঙ্গীত, দর্শন, সুফিবাদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত হয়।
শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি।
মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনি'র মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে মাদরাসাটি উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ প্রদান করা হতো।
বেশিরভাগ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত হয়েছে যে, আল কারাউইয়্যিনই ছিল বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
১৯৬৩ সালে একটি রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে একে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে মরক্কো। ১৯৬৫ সালে আল কারাউইয়্যিন নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি যুক্ত করা হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা সাইমন চার দিনের রিমান্ডে
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
রাতে ঢাকায় আসছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
হুতির বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে দফায় দফায় বিমান হামলা
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
লালমনিরহাটে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত নারীর মৃত্যু
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
চাঁদা না পেয়ে ভবনের রড-সিমেন্ট ট্রাকে তোলার চেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
অবৈধভাবে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের মেডিকেল কার্যক্রম, ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির আবেদনের সময় বাড়াল মন্ত্রণালয়
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুন্সিগঞ্জে পৃথক দুর্ঘটনায় যুবক ও বৃদ্ধা নিহত
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
থানার গেটে কথা-কাটাকাটি, পুলিশ সদস্যকে মারধরের অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নির্দেশনা
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ: বেরোবিতে ৩ শিক্ষককে পদাবনতি
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












