মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর কারণ: জ্ঞান চর্চা থেকে দূরে সরে আসা (১)
, ০২ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৪ ছামিন, ১৩৯৩ শামসী সন , ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০৮ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
স্বর্ণযুগে মুসলমানরা সারা বিশ্বজুড়ে শাসন করেছিলেন, এই ইতিহাস আমরা পাঠ করি। কিন্তু এর পেছনে ছিলো মুসলমানদের জ্ঞান চর্চার বিস্তর ইতিহাস। মুসলমানরা সেই সময় জ্ঞান চর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।
হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।” হাদীছ শরীফে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “জ্ঞান হচ্ছে সমস্ত কল্যাণের মূল, আর অজ্ঞতা হচ্ছে সমস্ত অকল্যাণের মূল।” এ কারণে ছাহাবীগণ সব সময় নিজেদের জ্ঞান চর্চায় আবদ্ধ রাখতেন। জ্ঞান চর্চাকে মুসলমানরা কতটা গুরুত্ব দিতেন, এটা বুঝা যায়, বদর যুদ্ধের বন্দি মুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের যারা অক্ষরজ্ঞান সমৃদ্ধ ছিলো, তারা মুসলমানদের মধ্যে যাদের অজ্ঞরজ্ঞান ছিলো না, তাদের অক্ষর জ্ঞান দেয়ার মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারতো। অর্থাৎ জ্ঞানও মুক্তিপণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তা মুসলমানরা দেখিয়ে দিয়েছেন।
ঐ সময় ছাহাবীগণ জ্ঞান চর্চার জন্য সবকিছুকে তুচ্ছ করতেন। হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জীবনী মুবারকে দেখা যায়, তিনি দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করার পর সবকিছু বাদ দিয়ে আখেরী রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করেছেন এবং হাদীছ শরীফ মুখস্ত করতেন। তিনি এ কাজ করতে গিয়ে রুটি-রুজি রোজগারে সময় ব্যয় করতেন না। এতে অনেক সময় তিনি ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতর হয়ে অচেতন হয়ে পড়তেন। অনেকে উনাকে দেখে ভাবতো, উনাকে জ্বীনে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবে উনার খেয়াল ছিলো নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে পবিত্র জ্ঞান হাছিল করা। হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন সর্বাধিক হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী ছাহাবী। সুবহানাল্লাহ!
ইংরেজীতে একটা কথা আছে, নলেজ ইজ পাওয়ার। জ্ঞান হচ্ছে শক্তি। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে জ্ঞান হাছিল করে তার বাস্তব প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। যার কারণে সারা পৃথিবী খুব কম সময়ের মধ্যে মুসলমানদের করায়ত্বে চলে আসে। অনেক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতন হয়ে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়। হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জীবনীতে পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি স্বর্ণখজিত কাপ্তানের কাপড় উনার নাক মোছার জন্য ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ কেউ যখন জ্ঞান চর্চা করে এবং সেই জ্ঞান বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারে, তখন তার কাছে ক্ষমতা, সম্পদ আসতে বাধ্য।
পৃথিবীতে যে কোন কিছু লাভ করতে হলে ৩টি জিনিস ব্যয় করতে হয়। ১. জ্ঞান, ২. সময় এবং ৩. অর্থ। এর একটি বিনিময় করে আবার অপরটি পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে উপরে অবস্থান করে জ্ঞান, অতঃপর সময় এবং শেষে অর্থ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ভুল বুঝে দৃষ্টি যখন তৃতীয় বিষয়ে (অর্থ) চলে যায়, তখন প্রথম বিষয়ের (জ্ঞান) সন্ধান সে পায় না।
এজন্য হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম বলেছেন, “জ্ঞান অর্থ সম্পদের চেয়ে উত্তম। কেননা, জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়, কিন্তু অর্থকে উল্টো পাহারা দিতে হয়। জ্ঞান হলো শাসক, আর অর্থ হলো শাসিত। অর্থ ব্যয় করলে নিঃশেষ হয়ে যায় কিন্তু জ্ঞান বিতরণ করলে আরো বৃদ্ধি পায়।”
বর্তমানকালে মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞান চর্চার বিষয়টি নেই বললেই চলে। মুসলমানরা শুধু সম্পদের পেছনে দৌড়ায়। এবং যতটুকু জ্ঞান চর্চা করে সেটাও সম্পদ পাওয়ার জন্য। পাশ করে সার্টিফিকেট পাবে, আর সেই সার্টিফিকেট দিয়ে চাকুরী পাবে, চাকুরী পেলে টাকা পাবে, মধ্যে সীমাবদ্ধ সবকিছু। অনেক উচ্চতর ডিগ্রি প্রাপ্ত লোককে দেখেছি, তার পয়সা কামানোর জন্য যতটুকু জ্ঞান দরকার, সেটুকুই জানে। তার বাইরে তেমন পড়ালেখাই নেই। কামাই-রোজগারের বাইরে ছোট একটা বইও পড়ার ধৈর্য্য হয় না তাদের।
স্বর্ণযুগের মুসলমানদের জ্ঞান চর্চার সেই স্বভাবটা এখন ইহুদী-নাছারারা নিয়ে গেছে। স্বর্ণযুগে জ্ঞান চর্চার শীর্ষে থাকার কারণে মুসলমানরা ছিলো সারা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাবান, আর এখন ইহুদী-নাছারারা জ্ঞান চর্চা ধারা চুরি করে নিজেরা ক্ষমতাবান হয়ে গেছে। মুসলমানরা হারিয়ে ফেলেছে তাদের ক্ষমতা।
দেখা যায়, জ্ঞান চর্চা তথা গবেষণা-বিশ্লেষণ করেই সব কিছুতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। এজন্য ইহুদী-নাছারারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন থিংক ট্যাংক (চিন্তাকেন্দ্র) বা পরামর্শ প্রতিষ্ঠান খুলে সবার মন-মগজ নিয়ন্ত্রণ করছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হলো, এক ধরনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান যা জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে বুদ্ধি বৃত্তিক কাজ করে জাতীয়-আন্তর্জাতিক নীতি তৈরি এবং প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কোম্পানিগুলো অর্থের বিনিময়ে বুদ্ধি বিক্রি করে। লক্ষণীয়, বিশ্বের অনেক ঘটনার পেছনে এইসব থিংক ট্যাঙ্ক গ্রুপগুলোর বুদ্ধি দেওয়া জড়িত, যা হয়তো স্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমানও হয় না। তাদের থেকে যখন কোন দেশ বা কোম্পানি বুদ্ধি কিনতে চায়, তখন তারা গবেষণা করে এমন কু-বুদ্ধি দেয়, যা ব্যবহারে ইহুদী-নাছারাদের কোন স্বার্থ হাছিল হয়।
একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। এখনো ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ চলমান। এই যুদ্ধের সূচনা হয়, ৭ই অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে। হামাসের একদল অকুতোভয় যোদ্ধা প্যারাসেইলিং করে সন্ত্রাসী ইসরায়েলে গিয়ে হামলা চালায়। ঐ হামলার মূল কারণ ছিলো সৌদি আরব সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে গিয়েছিলো, সেই স্বীকৃতি দানে বাধা দিতেই সেই সময় তাৎক্ষণিক হামলা। ফলে সৌদি আরবের স্বীকৃতি দান সাময়িক হলেও থেমে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, সৌদি আরব কেন সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিলো? এর কারণ সৌদি আরব ২০১৬ সালে সৌদি ভিশন ২০৩০ নামক একটি পরিকল্পনা উন্মোচন করে, যার মাধ্যমে সৌদি আরবে কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে চায়। দেখা যায়, সৌদি আরব সেই সকল উন্নয়নের কাজ ইসরায়েলি কোম্পানিদের দিয়ে করাতে চেয়েছিলো। কাজে যেন কোন বাধা না থাকে, সে জন্য সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে উদ্দত হয় সৌদি আরব। আর সেটা আটকাতেই হামাসের হামলা।
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সত্যের মাপকাঠি
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৩)
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (৪)
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা কবীরা গুনাহ ও অসন্তুষ্টির কারণ
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আল্লাহওয়ালা হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আদব রক্ষা করা আবশ্যক
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
একমাত্র খালিছভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যই ইবাদত করতে হবে
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত মাওলানা শাহ ছুফী আবুল খায়ের মুহম্মদ ওয়াজীহুল্লাহ নানুপূরী যাত্রাবাড়ীর হযরত মুর্শিদ কিবলা আলাইহিস সালাম উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক (৬ষ্ঠ পর্ব)
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (৯)
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বেপর্দা হওয়া শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে সহজ করার মাধ্যম
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহাসম্মানিত সুন্নত তরীক্বায় দোয়ার খাযীনাহ (৮)
১১ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












