পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত ‘লাইলাতুম মুবারকা’ই হচ্ছে পবিত্র শবে বরাত (৩)
, ৮ই শা’বান শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১১ তাসি’, ১৩৯২ শামসী সন , ০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রি:, ২৫ মাঘ, ১৪৩১ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
পবিত্র শবে ক্বদরে পবিত্র কুরআন শরীফ কোথায় নাযিল করা হয়েছে?
পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, পবিত্র শবে ক্বদরে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে। তবে কতটুকু, কোথায়, কিভাবে নাযিল করা হয়েছে সেটা সুস্পষ্ট বলা হয়নি। মূলত পবিত্র শবে ক্বদরে লাওহে মাহফূয থেকে প্রথম আসমানে বাইতুল ইয্যত নামক একটি হুজরা শরীফ রয়েছে সেখানে পুরো পবিত্র কুরআন শরীফ একত্রে নাযিল করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন-
اَنْزَلَ اللهُ الْقُرْاٰنَ اِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فِىْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ فَكَانَ اللهُ اِذَا اَرَادَ اَنْ يُّوْحِىَ مِنْهُ شَيْئًا اَوْحَاهُ فَهُوَ قَوْلُه {اِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِىْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ}
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র শবে ক্বদরে দুনিয়ার আসমানে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেন। এরপর যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি সেখান থেকে কোনো ওহী মুবারক করার ইচ্ছা মুবারক করেছেন তখন ওহী মুবারক করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘আমি পবিত্র শবে ক্বদরে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি’। ” সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে ত্ববারী ৩/১৯০)
কিতাবে আরো বর্ণিত রয়েছে-
وَلَا خِلَافَ اَنَّ الْقُرْاٰنَ اَنْزَلَ مِنَ اللَّوْحِ الْمَحْفُوْظِ لَيْلَةَ الْقَدْرِ عَلٰى مَا بَيْنَاهُ جُمْلَةً وَاحِدَةً فَوَضَعَ فِىْ بَيْتِ الْعِزَّةِ فِىْ سَمَاءِ الدُّنْيَا ثُمَّ كَانَ حَضْرَتْ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَنْزِلُ بِهِ نَجْمًا نَجْمًا فِى الْاَوَامِرِ وَالنَّوَاهِىِّ وَالْاَسْبَابِ وَذٰلِكَ فِىْ عِشْرِيْنَ سَنَةً وَقَالَ حَضْرَتْ اِبْنُ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ اَنْزَلَ الْقُرْاٰنَ مِنَ اللَّوْحِ الْمَحْفُوْظِ جُمْلَةً وَاحِدَةً اِلَى الْكُتُبَةِ فِىْ سَمَاءِ الدُّنْيَا ثُمَّ نَزَلَ بِهِ حَضْرَتْ جِبْرِيْلُ عَلِيْهِ السَّلَامُ نُجُوْمًا
অর্থ: আর এ বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে, পবিত্র কুরআন শরীফ সম্মানিত লাওহে মাহফূয থেকে একসাথে নাযিল হয়েছেন। অতঃপর প্রথম আসমানে অবস্থিত পবিত্র বাইতুল ইয্যত নামক হুজরা শরীফে রাখা হয়েছে। এরপর (মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মানিত নির্দেশ মুবারক অনুযায়ী) হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি সেখান থেকে ভাগে ভাগে আদেশ, নিষেধ এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নাযিল করেছেন। পবিত্র কুরআন শরীফ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অর্থাৎ ২৩ বছরে নাযিল হয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি বলেন, পবিত্র শবে ক্বদরে লাওহে মাহফূয থেকে দুনিয়ার আসমানে একসাথে পুরো পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হয়েছেন। এরপর মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছা মুবারক অনুযায়ী হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি সেখান থেকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট ভাগে ভাগে নিয়ে এসেছেন। সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে কুরতুবী ২/২৯৭)
বুঝা গেলো, পবিত্র শবে ক্বদরে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার মর্মার্থ হচ্ছে- সম্মানিত লাওহে মাহফূয থেকে দুনিয়ার আসমানে অবস্থিত ‘বাইতুল ইয্যত শরীফ’ নামক হুজরা শরীফে পুরো পবিত্র কুরআন শরীফ একত্রে নাযিল করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিতاَنْزَلَ ও نَزَّلَ শব্দদয় উনাদের পার্থক্য:
পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার বিষয়টা বুঝার জন্য পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিতاَنْزَلَ ও نَزَّلَ শব্দদয় উনাদের পার্থক্য বুঝা অত্যন্ত জরুরী। এই দুইখানা শব্দ মুবারক উনাদের পার্থক্য না বুঝার কারণে অনেকেই বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাই নিম্নে বিষয়টা আলোচনা করা হলো:
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে যেসব স্থানে اَنْزَلَ শব্দ এসেছেন সেসব স্থানে অর্থ হবে একত্রে নাযিল করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اِنَّا اَنْزَلْنٰهُ فِىْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি পবিত্র শবে ক্বদরে পবিত্র কুরআন শরীফ (একসাথে) নাযিল করেছি। (পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১)
মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْ اُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ
অর্থ: “পবিত্র রমাদ্বান শরীফ হলেন সেই সম্মানিত মাস, যেই সম্মানিত মাস মুবারকে পবিত্র কুরআন শরীফ (একসাথে) নাযিল করা হয়েছে। ” (পবিত্র সূরা বাক্বারাহ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৮৫)
আর যেসব স্থানে نَزَّلَ শব্দ এসেছেন সেখানে অর্থ হবে ধাপে ধাপে নাযিল করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَاِنَّا لَه لَحٰفِظُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি পবিত্র কুরআন শরীফ (ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে) নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই উনার হিফাযতকারী। ” (পবিত্র সূরা হিজর শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৯)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি ২৩ বছরে ধাপে ধাপে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছেন এবং তিনিই এই পবিত্র কুরআন শরীফ উনার হিফাযতকারী। সুবহানাল্লাহ!
এই দুই শব্দদ্বয় উনাদের পার্থক্য সম্পর্কে হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
اَنَّ التَّنْزِيْلَ مُخْتَصٌّ بِالنُّزُوْلِ عَلٰى سَبِيْلِ التَّدْرِيْجِ وَالْاِنْزَالُ مُخْتَصٌّ بِمَا يَكُوْنُ النُّزُوْلُ فِيْهِ دُفْعَةً وَاحِدَةً وَلِهٰذَا قَالَ اللهُ تَعَالٰى {نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَاَنْزَلَ التَّوْرٰةَ وَالْإِنْجِيْلَ} [آل عمران: ৩] اِذَا ثَبَتَ هٰذَا فَنَقُوْلُ لَمَّا كَانَ الْمُرَادُ هَاهُنَا مِنْ قَوْلِهِ تَعَالٰى {شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْاٰنُ} [البقرة: ১৮৫] اُنْزِلَ مِنَ اللَّوْحِ الْمَحْفُوْظِ اِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا
অর্থ: “নিশ্চয়ই اَلتَّنْزِيْلُ (আত তানযীল) শব্দ মুবারক পর্যায়ক্রমে নাযিল হওয়ার সাথে নির্দিষ্ট। আর اَلْاِنْزَالُ (আল ইনযাল) শব্দ মুবারক যা একসাথে নাযিল হয় তার জন্য নির্দিষ্ট। আর একারণেই মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘তিনি আপনার প্রতি সত্যসহ পবিত্র কিতাব মুবারক নাযিল করেছেন। আপনার নিকট যা আছে তার সত্যায়নকারী হিসেবে। আর তিনি (এর পূর্বে) পবিত্র তাওরাত শরীফ ও ইঞ্জীল শরীফও নাযিল করেছেন। ’ এটা যখন প্রমাণিত হলো। অতঃপর আমি বলবো, (কেউ যদি প্রশ্ন করে) মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম মুবারক ‘আমি পবিত্র মাহে রমাদ্বান শরীফে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি। ’ এই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার মর্মার্থ কি? এর জবাব হচ্ছে, (পবিত্র মাহে রমাদ্বান শরীফে) সম্মানিত লাওহে মাহফূয থেকে দুনিয়ার আসমানে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে। ” সুবহানাল্লাহ! (তাফসীরে রাযী ৫/২৫৪)
-হাফিয মুহম্মদ ইমামুল হুদা।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (১২)
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা কবীরা গুনাহ ও অসন্তুষ্টির কারণ
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বিধর্মী-অমুসলিমরা কখনো মুসলমানদের ভাই/বন্ধু নয়, বরং তারা মুসলমানদের চির শত্রু (৪র্থ পর্ব)
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মূর্তি, প্রতিমা, ভাস্কর্য, ম্যানিকিন ও ছবি নাজায়িয ও হারাম
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহাসম্মানিত সুন্নত তরীক্বায় দোয়ার খাযীনাহ (২৪)
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বেপর্দা হওয়া লা’নত ও হালাকীর কারণ
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
খাদিমু রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৮)
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র যিকির উনার গুরুত্ব ও ফযীলত (২)
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত- প্রাণীর ছবি হারাম
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












