পবিত্র ১৯শে রমাদ্বান শরীফ:
বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক আযাদী দিবস
, ১৯ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৯ আশির, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রি:, ২৪ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) বিশেষ আইয়্যামুল্লাহ শরীফ
২১শে ফেব্রুয়ারিকে আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করি। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য এদিন ভাষা সৈনিকরা প্রাণ দিয়েছিলো, সেই দিনটিকেই স্মরণ করে দিবসটি উদযাপন। তবে শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, বাংলা ভাষা নিয়ে আরেকটি দিবস আমাদের পালন করা উচিত। সেটা হচ্ছে বাংলা ভাষার স্বাধীনতা দিবস। দিবসটি হিজরী তারিখ হচ্ছে- “১৯শে রমাদ্বান শরীফ”। আসুন বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নেই।
ইতিহাস স্বাক্ষী হাজার বছর আগে বাঙ্গালি জাতির মুখে ‘এক কথ্য’ ভাষার প্রচলণ ছিলো। বাঙ্গালিরা সেই ভাষায় নিজেদের ভাব-আবেগ বিনিময় করতো। বাঙ্গালিদের মুখের সেই কথ্য ভাষা ছিলো ‘বাংলা ভাষা’র প্রাচীন রূপ। দক্ষিণ ভারত থেকে আগত সেন রাজারা এ অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করার পর বাঙ্গালির সেই মুখের ভাষাকে কেড়ে নিয়েছিলো, নিষিদ্ধ করেছিলো তার সর্বপ্রকার চর্চাকে।
তারা বলতো- সংস্কৃতি হলো দেবতাদের ভাষা আর বাঙ্গালির মুখের ‘বাংলা ভাষা’ হলো মানুষ রচিত ভাষা। তারা আরো বলতো ‘বাংলা’ হলো নিচু জাতের ভাষা। দীনেশ চন্দ্র সে ইতিহাস বর্ণনা করেছে। তার ভাষায়, “ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে হিন্দু মহল‘দূর দূর’ করিয়া তাড়াইয়া দিতো।” সেন শাসকরা প্রচার করতো, যারা বাংলা ভাষা শুনবে তারা ‘রৌরব’ নামক নরকে যাবে। ঐ সময় ‘সংস্কৃতি ভাষা’ রাজ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং বাংলা ভাষায় কথা বলা, লেখা ও শোনাকে হিন্দু শাসকরা রাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এ পরিস্থিতিতে নির্যাতিত বাঙ্গালিরা তুর্কি বংশোদ্ভূত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীকে আমন্ত্রণ জানান দক্ষিণ ভারতীয় অত্যাচারির কবল থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী নির্যাতিত বাঙালিদের সেই আবেদনে সাড়া জানান এবং মাত্র ১৮ জন ঘোর সওয়ারী নিয়ে বাংলায় ছুটে আসেন। সেই সময় নদীয়ার অত্যাচারি রাজা ছিলো লক্ষণ সেন। বখতিয়ার খিলজীর তেজোদীপ্ত আক্রমণে লক্ষণ সেন ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে এবং ভয় পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করে। ফলশ্রুতিতে স্বাধীন হয় বাংলা।
মুদ্রায় প্রাপ্ত প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় জানান দেয়, দিনটি ছিলো ৬০১ হিজরীর ১৯শে রমাদ্বান শরীফ। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে দিনটি হয় ১১ই মে, ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ (গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে)।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যম দিয়ে সেইদিন শুধু ভূমির বিজয় হয়নি, সাথে মুক্ত হয়েছিলো বাঙ্গালিদের মুখের ভাষা ‘বাংলা’। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বাঙ্গালির মুখের ভাষা বাংলাকে। খিলজী শাসনের শুরুতেই বাংলা ভাষার উপর সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় এবং বাংলা ভাষার সর্বপ্রকার চর্চাকে মুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পরাধীন থাকার পর স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাভাষা। তাই ৬০১ হিজরীর সেই ১৯শে রমাদ্বান শরীফ তারিখ ছিলেন বাংলা ভাষার স্বাধীনতা লাভের দিন।
ইতিহাসের আলোকে তেরশ’-চৌদ্দশ’ শতাব্দীর সময়কাল যদি বাংলা ভাষা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ না বলে বাংলা ভাষা সাহিত্যের পরিস্ফুটনের যুগ বলা হয়, তবে মানুষ ঐ সময়কার বাস্তব ইতিহাস সম্পর্কে আরো সঠিক ধারণা পেতে পারে।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর মাধ্যম দিয়েই যে বাংলা ভাষা স্বাধীনতা লাভ করেছিলো সে সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষাবিদদের বক্তব্য-
১. “মুসলমান শাসকগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের এইরূপ জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ-সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা।” (দ্রষ্টব্য: বৃহৎ বঙ্গ: দীনেশ চন্দ্র সেন)
২. ‘কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া হীরা যেমন জহুরির আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভেতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবুরির অপেক্ষা করিয়া থাকে, বাংলা ভাষা তেমনই কোনো শুভদিন শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিলো। মুসলিম বিজয় বাংলা ভাষার সেই শুভদিন শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিলো।’ [দ্রষ্টব্য: বাংলা ভাষার ওপর মুসলমানের প্রভাব: দীনেশ চন্দ্র সেন]।
৩. “যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হতো এবং এদেশে আরো কয়েক শতকের জন্য পূর্বের শাসন অব্যাহত থাকতো, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতো এবং অবহেলিত ও বিস্মৃত-প্রায় হয়ে অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো। [দ্রষ্টব্য: বাংলার সামাজিক ও সংস্কৃতির ইতিহাস: মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান]
৪. “তুর্কী বীর ইখতিয়ার বিন মুহম্মদ বখতিয়ার লক্ষণ সেনকে লক্ষণাবতী হইতে বিতাড়িত করিয়া বাংলায় সংস্কৃত চর্চার মূলে কুঠারাঘাত হানিয়া বাংলা চর্চার পথ উন্মুক্ত করেন।” [দ্রষ্টব্য: মুসলিম বাংলা-সাহিত্য: ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক]
বস্তৃতঃ মুহম্মদ বিন বখতিয়ারের হাতে ১৯শে রমাদ্বান শরীফ বঙ্গ-বিজয় বাংলা-ভাষার পক্ষে এক মহামুক্তির দিন। এ দিনটি না হলে আর্যদের হাতে যে বাংলা ভাষা লোপ পেতো অথবা পরিবর্তিত হয়ে ভিন্নরূপ ধারণ করতো, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এজন্য ১৯শে রমাদ্বান শরীফ হচ্ছেন বাংলা ভাষার স্বাধীনতা বা মুক্তির দিন।
বাংলা ভাষার স্বাধীনতা দিবস ‘১৯ রমাদ্বান’ পালন করার গুরুত্ব কি?
‘২১শে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন আধুনিককালে আমাদের ইতিহাস ও জাতিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাই, জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হই, তেমনি ১৯শে রমাদ্বান শরীফ বাংলা ভাষার স্বাধীনতা দিবস পালনের মধ্য দিয়েও আমরা আমাদের আদি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নৃ-তত্ত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারবো, যা দ্বারা আমাদের জাতিকে আরো সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ করতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মূলতঃ পবিত্র ১৯শে রমাদ্বান শরীফের চেতনার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙ্গালি জাতির মূল পরিচয় চিহ্ন। শোষিত, নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত হতে অত্যাচারিকে রুখে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার মূলমন্ত্র। বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় সংগ্রামের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। ভাষার প্রতি বাঙ্গালির চিরঞ্জীব ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। বস্তুত ১৯শে রমাদ্বানের চেতনাই কালে কালে দৃশ্যমান হয় বার বার। সেই চেতনায় পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে বাঙালীর মুক্তির সংগ্রামসমূহ।
-মুহম্মদ মুহিউদ্দিন রাহাত।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
এক নযরে সাইয়্যিদাতুন নিসায়ি আলাল আলামীন, আফযালুন নাস ওয়ান নিসা বা’দা রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আস সাবি‘আহ্ আত্বওয়ালু ইয়াদান আলাইহাস সালাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র পরিচিতি মুবারক
২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আজ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ৬ই যিলক্বদ শরীফ আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মুত্বহ্হার, মুত্বহ্হির, শাহ্ আমীরাহ্ সাইয়্যিদাতুনা হযরত মুজীরাতুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র বরকতময় বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবস মুবারক
২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত দুধ বোন সাইয়্যিদাতুনা হযরত শায়মা আলাইহাস সালাম
২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উম্মু সুলত্বানিন নাছীর আলাইহিস সালাম সাইয়্যিদাতুনা হযরত দাদী হুযূর ক্বিবলা আলাইহাস সালাম উনার বেমেছাল নিসবত মুবারক প্রকাশ
১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আবূ সুলত্বানিন নাছীর আলাইহিস সালাম সাইয়্যিদুনা হযরত দাদা হুযূর ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার একখানা মহাসম্মানিত বড় মাক্বাম মুবারক প্রকাশ
১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আস সাদিসাহ্ আলাইহাস সালাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র আযীমুশ শান নিসবতে আযীম শরীফ
১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদাতুনা হযরত নাক্বীবাতুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার আযীমুশ শান মহাসম্মানিত মহাপবিত্র নিসবতে আযীম শরীফ
১১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন, সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম উনার অনন্য খুছূছিয়ত মুবারক
১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র উম্মুল মু’মিনীন আল খ্বামিসাহ্ সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মাসাকীন আলাইহাস সালাম উনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি মুবারক
০৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে আবনাউ রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাইয়্যিদুনা হযরত খলীফাতুল উমাম আলাইহিস সালাম উনার বিশেষ শান মুবারক
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র আইয়্যামুল্লাহ শরীফসমূহ প্রকাশ সম্পর্কে বর্ণনা মুবারক
২৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে উম্মুল মু’মিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত আছ ছানিয়াহ্ আলাইহাস সালাম উনার মহাসম্মানিত আযীমুশ শান নিসবতে আযীমাহ্ শরীফ
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












