চেয়ার-টেবিলে খাবার খাওয়া বিদয়াত; খাছ ফতওয়া মতে হারাম
, ১৭ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৬ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ২৩ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) সুন্নত মুবারক তা’লীম
আমরা মুসলমান। আমাদের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণীয় হচ্ছেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, মহাসম্মানি মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা। কেননা, উনারাই হলেন সর্বোত্তম আদর্শ মুবারক। আহার করার ক্ষেত্রেও উনাদেরকেই অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ মহাসম্মানিত সুন্নতী তরীক্বাহ মুবারকেই আহার করতে হবে।
দস্তরখানায় খাবার পড়ে গেলে তা উঠিয়ে খাওয়া খাছ সুন্নত মুবারক। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা কখনো এক টুকরা বা একটা দানা খাবারও নষ্ট করেননি অর্থাৎ খাবার কখনো অপচয় করেননি। খাবার পড়ে গেলেও তুলে খেয়েছেন। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, প্রত্যেকটি খাদ্যের দানার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি ৭০ জন হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে নিয়োজিত রেখেছেন। সুবহানাল্লাহ!
সেজন্য উনারা ব্যবহার করেছেন খাছ সুন্নতী দস্তরখানা। কাজেই, আমাদের জন্য আবশ্যক হলো উনাদের ইত্তিবা মুবারক করা।
চেয়ার-টেবিলে খাবার খাওয়া হারাম
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, মাটির উপর অর্থাৎ মেঝেতে বা সমতল স্থানে দস্তরখানা বিছিয়ে তাতে খাদ্য-দ্রব্য রেখে আহার করা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক বা তরীক্বাহ মুবারক। কখনো কোন খাদ্য-দ্রব্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত খিদমত মুবারকে পেশ করা হলে তিনি তা মেঝেতে সমতল স্থানে দস্তরখানায় রাখতে মহাসম্মানিত নির্দেশ মুবারক দিতেন। কেননা এটা বিনয় ও আযীযী’র নিদর্শন মুবারক, দস্তরখানা পরকালে ছফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, কেননা এটা স্থানান্তর সাপেক্ষ। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরে সর্বপ্রথম যে চারটি বিদআতের প্রচলন শুরু হয়, তন্মধ্যে চেয়ার-টেবিলে পানাহার করা একটি। (ইহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন)
আল্লামা মানাউয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা বলেন, “টেবিলের উপর খাবার রেখে আহার করা হচ্ছে- অহংকারীদের অভ্যাস।” নাউযুবিল্লাহ!
চেয়ার-টেবিলে পানাহার করলে অবশ্যই বে-দ্বীন-বদদ্বীন ও বেধর্মীদের অনুসরণ করা হবে। কেননা তারাই চেয়ার-টেবিলে খাদ্য খাওয়ার পদ্ধতি চালু করেছে। সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ.
অর্থ: “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখবে, অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে সেই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে অর্থাৎ তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (আবূ দাউদ শরীফ)
কাজেই, কোন অবস্থাতেই চেয়ার-টেবিলে বসে খাদ্য খাওয়া জায়িয হবে না। বরং ইহা বিদআত ও গোমরাহীমূলক আমল। যারা চেয়ার-টেবিলে বসে খাদ্য খাবে তাদের হাশর-নশর অবশ্যই বে-দ্বীন-বদদ্বীন ও বেধর্মীদের সাথেই হবে। নাউযুবিল্লাহ!
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ مَا أَكَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلٰى خِوَانٍ وَلَا فِي سُكُرُجَةٍ وَلَا خُبِزٍ لَهٗ مُرَقَّقٌ. قُلْتُ لِـحَضْرَتْ قَتَادَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ عَلٰى مَا يَأْكُلُوْنَ قَالَ عَلَى السُّفَرِ.
অর্থ: “হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কখনো ‘খিওয়ান’ (টেবিলের মত উঁচু স্থানে)-এর উপর খাবার রেখে সম্মানিত আহার মুবারক করেননি এবং ছোট ছোট বাটিতেও তিনি সম্মানিত আহার মুবারক করেননি। আর উনার জন্য কখনো পাতলা রুটি তৈরী করা হয়নি। রাবী (হযরত ইউনুস রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি) বলেন, আমি হযরত ক্বত্বাদাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে উনারা কিসের উপর মহাসম্মানিত আহার মুবারক করতেন? তিনি বললেন, (খয়েরী রংয়ের) দস্তরখানার উপর।” (বুখারী শরীফ: কিতাবুত ত্বআমাহ: মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ শরীফ নং ৫৪১৫, তিরমিযী শরীফ: মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ নং ১৭৮৮, ইবনে মাজাহ শরীফ: মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ নং ৩৪১৭)
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত দস্তরখানা মুবারক ছিল চামড়ার এবং খয়েরী রংয়ের (খাসীর) চামড়ার। (শামায়েলে তিরমিযী শরীফ, আনিসুল আরওয়াহ্, জামউল ওসায়েল)
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দস্তরখানা বিছিয়ে মহাসম্মানিত আহার মুবারক করতেন। তিনি কখনো টেবিল বা টেবিলের মত উঁচু স্থানের উপর খাবার রেখে মহাসম্মানিত আহার মুবারক করেননি। তাই টেবিল বা টেবিলের মত উঁচু স্থানের উপর খাবার রেখে আহার করা সুস্পষ্ট বিদ্আত এবং জায়িয মনে করা কুফরী।
উল্লেখ্য, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত ওলীমা মুবারকের মধ্যেও দস্তরখানার বিশেষ ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু বর্তমানে বিবাহের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মহাসম্মানিত সুন্নতী দস্তরখানার ব্যবহার দেখা যায় না। কিন্তু মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে প্রমাণিত হয় যে, চেয়ার-টেবিলে নয়; বরং দস্তরখানায় খাদ্য খাওয়া খাছ সুন্নত মুবারক। আর চেয়ার-টেবিলে খাদ্য খাওয়া সু¯পষ্ট বিদ্আত-গোমরাহী ও জায়িয মনে করা কুফরী।
যমীনে বা মেঝেতে অর্থাৎ সমতল স্থানে বসে খাবার খাওয়া খাছ সুন্নত মুবারকঃ
সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত-
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَجْلِسُ عَلَى الْأَرْضِ وَيَأْكُلُ عَلَى الْأَرْضِ.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যমীনের বা মেঝের উপর বসতেন এবং যমীনে বা মেঝেতে বসে মহাসম্মানিত আহার মুবারক করতেন। (শুআবুল ঈমান শরীফ, বায়হাক্বী শরীফ, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ নং: ৭৮৪৩; আল মু’জামুল কাবীর, তবারানী, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ নং: ১২৪৯৪; মাজমাউয যাওয়ায়িদ, মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ নং: ১৪২২২)
উল্লেখ্য, এখানে যমীনে বা মেঝের উপর বসে খাওয়ার অর্থ হচ্ছে সমতল স্থানে বসে খাওয়া। অর্থাৎ যেখানে বসা হয়েছে পাত্র তার চেয়ে উঁচু স্থানে বা উঁচু কোনো কিছুতে রেখে না খাওয়া। তবে কেউ যদি চকিতে বসে চকির মধ্যেই দস্তরখানা বিছিয়ে তার উপরই পাত্র রেখে খাবার খান তাহলে সেটাও যমীনে বসে খাওয়ার মধ্যেই গণ্য হবে।
-আহমদ হুসাইন
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পেট পুরে আহার করা মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার খিলাফ
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আঙুল, হাত ও বাসন চেটে খাওয়া:
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র জুমুয়াহ শরীফ দিনের মহাসম্মানিত সুন্নতী আমল মুবারক
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
খাবারে ও পান পাত্রে ফুঁক দেওয়া মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক উনার খিলাফ
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুয়ানাকা করা মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুছাফাহা করা মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারক। যা গুনাহ মাফের মাধ্যম
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
খেজুর ও তরমুজ একত্রে খাওয়া খাছ সুন্নত মুবারক
৩০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে ৬টি রোযা রাখা খাছ সুন্নত মুবারক এবং বেমেছাল ফযীলত মুবারক লাভের মাধ্যম (৪)
২৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে ৬টি রোযা রাখা খাছ সুন্নত মুবারক এবং বেমেছাল ফযীলত মুবারক লাভের মাধ্যম (৩)
২৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে ৬টি রোযা রাখা খাছ সুন্নত মুবারক এবং বেমেছাল ফযীলত মুবারক লাভের মাধ্যম (২)
২৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে ৬টি রোযা রাখা খাছ সুন্নত মুবারক এবং বেমেছাল ফযীলত মুবারক লাভের মাধ্যম (১)
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র ঈদুল ফিতর সংক্রান্ত মহাসম্মানিত সুন্নতী আমল সমূহ (২)
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












