ইতিহাস
ভারতের হায়দরাবাদ দখল করে রাখার চাপা ইতিহাস
, ১৭ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১৭ ছানী আ’শার, ১৩৯২ শামসী সন , ১৬ মে, ২০২৫ খ্রি:, ৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) ইতিহাস
হায়দরাবাদে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে। তখন থেকেই হায়দরাবাদকে কেন্দ্র করে মুসলিম শিল্প-সংস্কৃতির যে বিকাশ ঘটে তা পুরো দাক্ষিণাত্যকে প্রভাবিত করেছিলো। ভারতের ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও হায়দরাবাদ পুরোপুরি স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি। ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তি সাপেক্ষে এটি একটি দেশীয় রাজ্যে পরিণত হয়। ৮২,৬৯৮ বর্গমাইল এলাকা বিস্তৃত এবং বাংলাদেশের তুলনায়ও আয়তনে বড় দেশ হায়দরাবাদ।
শুধু আয়তনে নয়, সম্পদ, সমৃদ্ধি এবং সামর্থ্যরে দিক থেকেও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঠিক থাকার সকল যোগ্যতাই হায়দরাবাদের ছিলো। হায়দরাবাদের খনিজ সম্পদের মধ্যে কয়লা, সোনা, লোহা, হীরক প্রভৃতির আকর ছিলো। কৃষি সম্পদের মধ্যে চাল, গম, জওয়ার, বজরা, তিল, তিসি ভুট্টা, তামাকের প্রচুর ফলন ছিলো। দেশটিতে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছিলো। নিজস্ব আইন আদালত ছিলো। বিচার ব্যবস্থা ছিলো। নিজস্ব মুদ্রা ছিলো, সেনাবাহিনী ছিলো, হাইকোর্ট ছিলো, ছিলো শুল্ক বিভাগ। নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো। ছিলো ভাষা, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত। দেশে দেশে রাষ্ট্রদূত ছিলো, এমনকি জাতিসংঘে নিজস্ব প্রতিনিধিও ছিলো।
১৯৪৭ সালের ১৬ জুলাই ইংল্যান্ডের ভারতীয় বিষয়ক সচিব লিষ্টোয়েল এক সভায় বলেছিলো, ‘এখন থেকে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলো হতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো। দেশীয় রাজ্যগুলো ভারত অথবা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনটিতে যোগ দেবে, অথবা স্বাধীন সত্তা বজায় রাখবে তা সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছাধীন। ব্রিটিশ সরকার সে বিষয়ে কোন রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে না’।
হায়দরাবাদ ভারত বা পাকিস্তান কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদনও জানিয়েছিলো। কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতারা সামরিক এই মুসলিম দেশটিকে জোর করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ‘অপারেশন পোলো’ নামের এক সামরিক অভিযান চালায় ভারতীয় সেনাদের দিয়ে। (গোটা ভারতবর্ষের মধ্যে হায়দরাবাদ-দাক্ষিণাত্যে ছিলো পোলো নামক অভিজাত খেলার সবচেয়ে বেশি ময়দান।)
সময়টি ছিলো ১৯৪৮ সালে। ৭৫ বছরেরও বেশী সময় আগে সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের শেষ স্বাধীন মুসলিম সালতানাত বা রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অবসান ঘটে। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর হাতে হায়দরাবাদের স্বাধীনতার পক্ষের যোদ্ধাদের পরাজয় ঘটে সেদিন।
১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ‘অপারেশন পোলস’ নামক এক সামরিক অভিযান চালানো হয়, যার মাধ্যমে হায়দরাবাদ নাজুক রাজ্যকে ভারতের সাথে যুক্ত করা হয়।
দাক্ষিণাত্য নামে পরিচিত এই মুসলিম রাষ্ট্রের শেষ সুলতান ওসমান আলী খান নিজাম-উল-মুলক আসেফ জাহ (নবম) ভারতীয় হামলা শুরুর পর ছয় দিন প্রতিরোধ চালিয়ে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপক রক্তপাত এড়াতে তার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ফলে প্রায় ৬০০ বছরের স্বাধীন এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অবসান ঘটে। অবসান হয় আসেফ জাহ’র পূর্বপুরুষদের ২২৪ বছরের শাসন।
সেই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বল্লভ সদ্য স্বাধীন হায়দরাবাদ রাজ্যকে ভারতের সাথে যুক্ত করতে হায়দরাবাদে সেনাবাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। ভারতীয় সেনাদের সেই অভিযান ব্যাপক বিপর্যয় বয়ে এনেছিলো স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য। বিশেষ করে মারাথওয়ারা অঞ্চলের পরিস্থিতি হয়ে পড়েছিলো ভয়াবহ।
লোক দেখানো তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো; ওই তদন্তের ফলাফল কখনও প্রকাশ করা হয়নি। “হায়দারবাদ: একটি মুসলিম ট্র্যাজেডি” শীর্ষক এক প্রবন্ধে অধ্যাপক উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ বিবেকবান হিন্দু প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য উল্লেখ করে লিখেছে, “যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর মুসলমানরা (গণহারে) ব্যাপক আঘাত ও পাশবিক হামলার শিকার হয়। ধ্বংসযজ্ঞের পর যারা বেঁচে ছিলেন তারাও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো। তাদের হাজার হাজার ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় এবং উচ্ছেদ করা হয় কয়েক লাখকে। মুসলিম বাহিনীর সহযোগীদের কথিত সহিংসতার প্রতিশোধ নেয়ার অজুহাত দেখিয়েই এইসব নারকীয় অভিযান চালানো হয়েছিলো।” (১৯৫০ সালে প্রকাশিত ‘দ্যা মিডল-ইস্ট জার্নাল’, ৪ খ-)
হায়দরাবাদ-দাক্ষিণাত্য আরব ও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুবাদে ইসলামি সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হয়েছিলো। এখানে ফারসি ভাষা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো। ইসলামপূর্ব যুগেও দাক্ষিণাত্য উত্তর ভারতের মাধ্যমে স্বল্প কিছু কাল পদানত থাকলেও বেশির ভাগ সময়ই স্বাধীন ছিলো। ভারতে তুর্কি মুসলিম তোঘলক বংশের শাসনামলে এই দেশটি ১৩৪৭ সালে আলাউদ্দিন হাসান বাহমান শাহের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করে। ইরানি বংশোদ্ভূত এই জেনারেল প্রতিষ্ঠা করেন বাহমানী বংশের রাজত্ব।
সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে এই রাষ্ট্র ৫টি পৃথক সালতানাতে বিভক্ত হয়েছিলো। এসবের মধ্যে প্রধান তিন শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো আহমদ নগরের নিজামশাহী রাজ্য, বিজাপুরের আদেলশাহী রাজ্য এবং হায়দরাবাদ-গোলকু-ার কুতুবশাহী রাজ্য। এই রাষ্ট্রগুলো শিয়া মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিলো। তাই এই রাষ্ট্রগুলোর প্রধানরা ভারতবর্ষের মোঘল শাসকদের পরিবর্তে ইরানের সাফাভি বংশের শাসকদেরকে নিজেদের শাসক হিসেবে মান্য করতো। আদেলশাহী ও কুতুবশাহী রাজবংশের শাসকরা ছিলেন মূলত তুর্কিভাষী ইরানি বংশোদ্ভূত। মোঘল শাসক আওরঙ্গজেব ১৬৮৬ ও ১৬৮৭ সনে এই দুই বংশের রাজ্য জয় করে নেন।
১৭২৪ সালে দাক্ষিণাত্য আবারও বিচক্ষণ জেনারেল কামারউদ্দিন খান নিজামুল মুলক আসফ জাহ’র নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই আসফ জাহ ছিলেন উঁচু মানের একজন ফার্সি কবি। তিনি নাদির শাহের ভারত আক্রমণের সময় দিল্লিতে উপস্থিত ছিলেন। ভারত বিজেতা নাদির শাহ আসফ জাহের কাছে গোটা ভারতের শাসনভার অর্পণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পরাজিত মোঘল শাসক মোহাম্মাদ শাহের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবিনয়ে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হাজিব আল মানসুর: যে সেনাপতি পরাজিত হননি কোনো যুদ্ধে
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র আযানের জন্য ২২ জন মুসলমানের শহীদ হওয়ার ঈমানদীপ্ত ঘটনা
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












