বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা-পরিচালনা তুলে দেয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদ
, ২২ রবীউল আউওয়াল শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৭ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ২১ ভাদ্র, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) তাজা খবর
বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। দেশের অধিকাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দরটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে কনসেশন ভিত্তিতে পরিচালনার উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গতকাল জুমুয়াবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এসব কথা জানিয়েছেন বন্দররক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এনসিটি ইজারার উদ্যোগ নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাতিল বা পুনর্মূল্যায়ন করলেও রহস্যজনক কারণে এনসিটি ইজারার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
চট্টগ্রামের শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, বন্দর শ্রমিক এবং জাতীয়ভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক আন্দোলন-প্রতিরোধের মুখে সে সময় সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয় বলে তারা জানান।
বর্তমান সরকারও বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের পরিবর্তে পূর্ববর্তী সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। অথচ দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিল্পখাতের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক মনোযোগ প্রয়োজন। ফলে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং সরকারের ঘোষিত "সবার আগে বাংলাদেশ" নীতির সঙ্গে এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তারা আরও বলেন, এনসিটি ও সিসিটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জনবল এসব টার্মিনাল সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে। বর্তমান অবকাঠামো, বিদ্যমান যন্ত্রপাতি এবং পরিচালন সক্ষমতা বিবেচনায় দেশীয় ব্যবস্থাপনায় যখন সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তখন বিদেশি অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা কী?
চূড়ান্ত ইজারা চুক্তির আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি করবে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভবিষ্যৎ অপারেটরদের জন্য একটি উচ্চ আয়ের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই এই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
তারা আরো জানিয়েছেন, এনসিটির রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো পরিবর্তিত হলে বাংলাদেশের আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বন্দর ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা। প্রস্তাব অনুযায়ী, টার্মিনালের রাজস্ব প্রথমে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোষাগারে জমা না হয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে সংগ্রহ করা হবে এবং পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত অংশ প্রদান করা হবে। বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত ও রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই কাঠামো পরিবর্তিত হবে। এতে বাংলাদেশ সরাসরি টার্মিনালের সম্পূর্ণ পরিচালনাগত আয় না পেয়ে কেবল চুক্তিতে নির্ধারিত ইজারা ফি বা রাজস্বের অংশ পাবে। ফলে চুক্তির আর্থিক শর্ত অনুকূল না হলে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় সরকারের নিট আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সংগৃহীত অর্থ বিদেশে অবস্থান করলে তার আর্থিক সুবিধা নয়, বরং অপারেটর প্রতিষ্ঠান ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিদেশি অপারেটর এলে দুর্নীতি কমবে- এমন ধারণা প্রায়ই প্রচার করা হয়। কিন্তু দুর্নীতির মূল কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব এবং তদারকির ঘাটতি। বন্দর প্রশাসন দক্ষ, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত হলে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একইভাবে কনটেইনার জট বা বন্দরের ধীরগতির জন্য শুধু বন্দরকে দায়ী করা যায় না। কাস্টমসের ডকুমেন্টেশন, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালসের কাছে পিসিটির পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করে। ইজারার সময় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের কথা সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে প্রচার করা হলেও শুরুতে সেই বিনিয়োগ দৃশ্যমান হয়নি। সম্প্রতি কিছু নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলোর একটি বড় অংশ পরিচালন কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। পিসিটির অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত করে যে, শুধু বিদেশি অপারেটর নিয়োগই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বিনিয়োগ বা কাক্সিক্ষত সক্ষমতা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। এর আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং জ্বালানি অবকাঠামো অবস্থিত।
বন্দর পরিচালনার সঙ্গে বাণিজ্যিক তথ্য, জাহাজ চলাচল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা জড়িত। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলছেন বক্তারা।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু ভূখ-ের ওপর কর্তৃত্বের বিষয় নয়; বরং কৌশলগত অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ভারত থেকে আসা ১৩৫ টন চালে বিষাক্ত ও ক্ষতিকর উপাদান
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পদ্মার ভাঙন তীব্র, দুই মাসে বিলীন ৫০০ বিঘা জমি
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ভোক্তার ব্যয় বাড়ার পেছনে দায় কার?
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ এখন মুদিপণ্য
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ৪ পিস কদু!
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা: ৪ শর্তে আটকে গেছে চুক্তি
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সৌদি কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, ২ মৃত্যুদ-ের তথ্য চাইলো ঢাকা
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মোবাইল টাওয়ারের তার কেটে নিল উপজাতি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারক অবমাননাকারীদের মৃত্যুদ- দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল,সীমান্ত রক্ষাসহ ১৬ দফা দাবীতে সমাবেশ
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’দাদ ১২ই শরীফ উনার সম্মানার্থে অনন্য আয়োজন
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ফের মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হলে সাবমেরিন ক্যাবলে হামলার পরিকল্পনা ইরানের
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, পুলিশ কর্মকর্তা নিহত
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












