পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
(রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার ওয়াজ শরীফ থেকে সংকলিত)
, ০৬ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৬ আশির, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রি:, ১২ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মহিলাদের পাতা
(ধারাবাহিক)
প্রসঙ্গে বলা হয়, অনেক হাদীস শরীফে এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। যে বনী ইসরাঈল আমলে একজন দরবেশ ছিলেন। যার নাম ছিল জুরাইজ। সেই জুরাইজ দরবেশ জঙ্গলে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগী করতো। দিন-রাত্র চব্বিশ ঘন্টা সে ইবাদত-বন্দেগী, জিকির-ফিকির, রিয়াজত-মুশাক্কাতে মশগুল থাকতো। যেই জঙ্গলে জুরাইজ দরবেশ একটা খড়ের ঘর অর্থাৎ মাটি ও খর দিয়ে একটা ঘর তৈরী করে ইবাদত-বন্দেগী করতো।
সেই জঙ্গলে গিয়ে একদিন জুরাইজ দরবেশের মা দুর থেকে ডাকলেন। ‘জুরাইজ’, ‘জুরাইজ,’ ‘জুরাইজ’ তিনবার ডাক দিলেন। দরবেশ জুরাইজ নামাজ পড়তেছিলেন। উনি মনে মনে চিন্তা করলেন, আমি কি নামাজ পড়বো, না মা’র ডাকে সারা দিব? না নামাজ ছেড়ে দিবো? চিন্তা-ফিকির করতে করতে উনি নামাজেই রয়ে গেলেন।
উনার মা ডেকে চলে গেলেন। একদিন, দু’দিন, তিনদিন হলো- প্রত্যেকদিনই উনার মা এসে তিনবার করে ডাক দিলেন। কিন্তু প্রতিদিন প্রতি ডাকের সময় তিনি নামাজে মশগুল ছিলেন।
জুরাইজ দরবেশ চিন্তা করতে ছিলেন যে আমি নামাজ ছেড়ে দিব অথবা মার ডাকে সাড়া দিব। কিন্তু তার আর ডাকে সাড়া দেয়া হয়নি, নামাজও ছাড়া হয়নি। জুরাইজ দরবেশের মা যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন মনের দুঃখে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সন্তানের সম্পর্কে কিছু দোয়া বা বদদোায়া করে চলে গেলেন।
এদিকে জুরাইজ দরবেশের আমল-আখলাকের কারণে তার ছিরত-ছুরতের কারণে, স্বভাব চরিত্রের কারণে সমস্ত এলাকাতে বনী ইসরাঈলের মধ্যে খুব সুনাম হয়ে গেল যে, একজন বিশিষ্ট আল্লাহ পাক উনার ওলী রয়েছেন। তখন জুরাইজ দরবেশ যার কাছে মানুষ আসতো নানা ফায়দার জন্য, মানুষ খুব বড় বুজুর্গ মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী মনে করে তাতে তারা ফায়দাও লাভ করতো।
সেই এলাকায় একটা খারাপ মহিলা ছিল। সে মহিলা যেহেতু মানুষের স্বভাব-চরিত্র নষ্ট করতো, সে কিছু লোককে বললো, যে জুরাইজ দরবেশের খুব নাম-ধাম হয়েছে তাকে যেভাবে হোক নষ্ট করতে হবে। মুলতঃ তার পিছনে শয়তান সাওয়ার হয়েছিল। সে কোশেশ করলো সেই জুরাইজ দরবেশকে ওয়াসওয়াসা দেয়ার জন্য। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক তিনি জুরাইজ দরবেশকে হিফাযত করলেন। সেখানে এক রাখালের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে শেষ পর্যন্ত রাখালের সাথে সে খারাপ মহিলা অবৈধ কাজে জড়িত হয়ে যায়। যার শেষ পরিণতিতে তার একটা সন্তান হলো।
যখন সেই খারাপ মহিলার সন্তান হলো তখন মানুষ তাকে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার সন্তান কোথা থেকে এলো? সে তৎক্ষণাৎ বললো, ‘সন্তান হচ্ছে জুরাইজ দরবেশের।’ জুরাইজ দরবেশের সন্তান! মানুষ খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো এবং তারা শেষ পর্যন্ত এই কথাটা তাদের যে বাদশাহ ছিল তার কানে পৌঁছালো। যে সমস্ত মানুষ তাকে বড় দরবেশ বলে জানে, বড় বুযুর্গ বলে মানে, ওলী আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে, আপনিও বিশ্বাস করেন, হে বাদশাহ্। কিন্তু এই দরবেশের মধ্যে অকল্পনীয় বদ আখলাক রয়েছে এবং ঘটনা ঘটেছে। এক খারাপ মহিলা বলতেছে তার যে সন্তান হয়েছে সেটা হচ্ছে জুরাইজ দরবেশের।
তখন বাদশাহ সেই মহিলাকে ডাকাল সে একই কথা বললো। তখন বাদশাহ তার সৈন্য সামান্ত লোকজন পাঠালো। এখনই জুরাইজ দরবেশকে পাকড়াও করে নিয়ে আস। তারা জুরাইজ দরবেশের নিকট এসে তার যে ঘর ছিল খড়কুঠা ও মাটি দিয়ে তৈরী সেটাকে ভেঙ্গে ফেলে দিল এবং তাকে কিছু তারা অপমানও করলো, মানহানিও করলো, অশ্লীল ভাষায় কিছু গালি-গালাজও করলো। তুমি এই রকম দরবেশ, তোমার এই আমল ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাকে পাকড়াও করে মানুষ নিয়ে যেতে লাগলো যে তোমাকে বাদশাহ্র কাছে যেতে হবে। জুরাইজ দরবেশ আর কিছুই বললো না। সে তাদের সাথে যেতে লাগলো। হঠাৎ রাস্তায় একখানে গিয়ে অর্থাৎ বাদশাহর নিকটবর্তী স্থানে গিয়ে জুরাইজ দরবেশ মুচকি হাসলো। মুচকি হেসে সে আবার তার হাসি থামায়ে নিল।
বাদশাহ দূর থেকে লক্ষ্য করলো যে, জুরাইজ দরবেশ কি করতেছে। যখন বাদশাহর দরবারে গিয়ে পৌঁছলো বাদশাহ বললো, ‘হে জুরাইজ দরবেশ! আপনি কি শুনেছেন আপনার সম্পর্কে মানুষ কি বলে?’
জুরাইজ দরবেশ বললেন যে, ‘কি বলে মানুষ আমার সম্পর্কে?’
আপনার সম্পর্কে বলে, ‘একটা খারাপ মহিলার সাথে আপনার অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। যার কারণে একটা সন্তান হয়েছে।’
জুরাইজ দরবেশ বললো, ‘কোথায় সে সন্তান, সেটা আমার কাছে নিয়ে আস।’
তখন সেই সন্তানকে আনা হলো। সে তার পেটে হাত রেখে বললো, ‘হে সন্তান বলতো দেখি, তোমার পিতা কে?’ মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরতে (যেহেতু হাক্বীক্বত জুরাইজ দরবেশ মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী ছিলেন, বুযুর্গ ছিলেন), সে বাচ্চা জবাব দিল, ‘আমার পিতা হচ্ছে অমুক রাখাল।’
স্পষ্টভাবে সে নাম বলে দিলো। বলে দেয়ার পর মানুষ তো তা’য়াজ্জুব হয়ে গেল যে এটা কি করে সম্ভব একটা সন্তান দুই/চার দিন হলো জন্ম হয়েছে। পাঁচ/সাত দিন হয়েছে সে কথা বলে কি করে এটা আশ্চর্যের কথা।
সকলেই সেই জুরাইজ দরবেশের পায়ে পড়ে গেল। যারা খারাপ ব্যবহার করেছিল, যারা মানহানী করেছিল এবং ঘর ভেঙ্গে ছিল, তারা সকলেই পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইলো যে আমাদের মাফ করুন ভুল হয়ে গিয়েছে।
বাদশাহ বললো, ‘এখন আপনি যদি বলেন তাহলে আপনার ঘরটা আমরা স্বর্ণ দিয়ে তৈরী করে দেই।’
জুরাইজ দরবেশ বললেন যে, ‘না আমার স্বর্ণের দরকার নেই। আমারটা যেমন ছিল তদ্রুপ করে দেও।’
বাদশাহর লোকেরা সেটা পূর্বের মত করে দিলো। তখন বাদশাহ বললো আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে, হে জুরাইজ দরবেশ! আপনি যখন আমার এখানে আসতে ছিলেন তখন আপনি রাস্তায় হঠাৎ মুচকি হাসলেন তার কি কারণ?
উনি বললেন দেখ, ‘মুচকি হাসলাম এই জন্য যে আমার মায়ের বদদোায়া কবুল হয়েছে, সেই জন্য আমি হাসলাম। তোমরা আমাকে এখানে এনেছ আমি সেটা জানি। আমার মায়ের বদদোয়া কবুল হয়েছে সে জন্য আমি মুচকি হাসলাম।
কি বদদোায়া কবুল হয়েছে? আমার মা তিনদিন গিয়ে আমাকে তিন বার করে ডেকেছিলেন, আমি জবাব দেইনি। আমার মা যাওয়ার সময় বদদোায়া করেছিলেন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার সন্তান আমার ডাকে সাড়া দিল না। তুমি তাকে খারাপ মহিলার চেহারা না দেখায়ে তার মৃত্যু দিও না। আমি এতদিন পর্যন্ত কোন খারাপ মহিলার চেহারা দেখিনি, আজকে হে বাদশাহ্! তোমার দরবারে আসার সময় সেই খারাপ মহিলার চেহারা দেখলাম। দেখার পর আমি হাসলাম এইজন্য যে আমার মার বদদোয়া কবুল হয়েছে।’
ثلاث دعوات مستجابات لاشك فيهن.
তিনটা দোয়া অবশ্যই অবশ্যই কবুল হয়। যা নির্ঘাত কবুলযোগ্য তাতে কোন সন্দেহ নেই।
دعوة المظلوم دعوة المسافر دعوة الوالدين.
মজলুমের দোয়া বা বদদোয়া মুসাফিরের বদদোয়া বা দোয়া আর পিতা-মাতার দোয়া বা বদদোয়া অবশ্যই কবুলযোগ্য এটা কেউ ফেরাতে পারবে না। অবশ্যই অবশ্যই কবুল হবে। কাজেই যে তার পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট করে জান্নাত হাছিল করতে পারে, তার জন্য খায়ের বরকত। আর যে করতে পারবে না, তার জন্য শত আফসোস, তার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে বদ্ নছীবী ও বদবখ্তী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মহিলাদের সুন্নতী লিবাস, অলংকার ও সাজ-সজ্জা (২০)
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হাশরের ময়দানে যে ৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেককেই দিতে হবে
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা বেমেছাল ফযীলত মুবারকের অধিকারী
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রত্যেকেই মহান আল্লাহ পাক উনার মনোনীত এবং পবিত্র ওহী মুবারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সর্বক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রাধান্য দিতে হবে
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত মুবারক উনার মধ্যে ছিলেন, আছেন এবং অনন্তকাল থাকবেন
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পিতা-মাতা উভয়েই দ্বীনদার হওয়া ব্যতীত দ্বীনদার সন্তান আশা করা সম্পূর্ণ বৃথা (২)
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ক্বলবী যিকির জারী না থাকলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ মাহফিল উনার ইন্তিজামকারী বিনা হিসাবে সম্মানিত জান্নাতে প্রবেশ করবেন
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
হীলাহ্ বিবাহ এবং তার শরয়ী ফায়সালা (২)
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা কাট্টা কুফরী
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন মুবারক করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব-শরাফত বজায় রাখতে হবে
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












