ধ্বংস, উচ্ছেদ ও বিভাজন: গাজার রণকৌশল এবার লেবাননে
, ২৬ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৬ আশির, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রি:, ২ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) বিদেশের খবর
আল ইহসান ডেস্ক:
মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে লেবাননজুড়ে লাশের মিছিল আর হাহাকার। ইসরায়েলি হামলায় ৬০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু আর সাড়ে ৭ লাখ মানুষের ঘরছাড়া হওয়ার এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি গাজায় ব্যবহৃত সেই ভয়াবহ রণকৌশলেরই নতুন এক সংস্করণ। সন্ত্রাসী ইসরায়েলের এই কৌশলের ছকটি বেশ পরিচিত- প্রথমে উচ্ছেদের হুমকি বা জীবনধারণের সব পথ বন্ধ করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করো, এরপর বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে তৈরি করো ‘বাফার জোন’, যাতে কেউ আর নিজ ভিটায় ফিরতে না পারে। সবশেষে, পুরো অঞ্চলকে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন খ-ে ভাগ করে দেওয়া, যাতে সেখানে কোনো শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা মাথা তুলতে না পারে।
ফিলিস্তিনে তিন বছর কাজ করার সুবাদে এই ধ্বংসাত্মক নকশাটি খুব কাছ থেকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে আমার। এখন বৈরুতে বসে ঠিক একই ইতিহাসের নির্দয় পুনরাবৃত্তি দেখছি। আল-জাজিরায় প্রকাশিত দক্ষিণ আফ্রিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী জোনাথন-এর এই বিশেষ বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হলো-
নকশাটি কেমন?
পশ্চিম তীরে সন্ত্রাসী ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ভূখ-কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে রেখেছে। পানির কূপে সিমেন্ট ঢেলে দেওয়া, অনুমতি নেই অজুহাতে ঘরবাড়ি ভাঙা- সবই ছিলো ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার কৌশল। গাজায় এই একই কাজ করা হয়েছে আরও দ্রুত এবং ভয়াবহভাবে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সন্ত্রাসী ইসরায়েল ঘোষণা দেয়- গাজার উত্তরাঞ্চলের সবাইকে সরে যেতে হবে। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয় ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’- খাবার নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। এভাবে একটি পুরো জনসংখ্যাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে তাদের জীবনকে মূল্যহীন করে তোলা হয়। ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী গাজাকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করে ম্যাপ প্রকাশ করে। যখন কোনো ব্লকের নম্বর ডাকা হতো, সেখানকার মানুষকে ঘর ছাড়তে হতো। এই উচ্ছেদ বা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশগুলোই ছিলো পরবর্তী অপরাধগুলোর অজুহাত। মানুষকে বলা হয়েছিলো ‘আল-মাওয়াসি’ নামের একটি সৈকতে আশ্রয় নিতে, যাকে তারা ‘নিরাপদ অঞ্চল’ বলেছিলো। কিন্তু সেখানেও বিমান হামলা অব্যাহত ছিলো। এভাবেই এলাকাগুলো জনশূন্য করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
সন্ত্রাসী ইসরায়েলের এই পদ্ধতির তিনটি মূল স্তম্ভ হলো- ধ্বংস করা, উচ্ছেদ করা এবং ভেঙে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য অঞ্চলটি শান্ত করা নয়, বরং তা খালি করা। গাজা এবং দক্ষিণ লেবানন- উভয় ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসী ইসরায়েল সাধারণ মানুষকে তাদের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের থেকে আলাদা করে দেখছে না। তাদের এই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়াই সন্ত্রাসী ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য।
একই কৌশলের নতুন প্রয়োগ লেবানন:
লেবাননেও এখন একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে, ১৯৮০-এর দশকের যুদ্ধের সঙ্গে এর একটি বড় পার্থক্য আছে। তখন সন্ত্রাসী ইসরায়েল চেয়েছিলো লেবাননে তাদের পছন্দের সরকার বসাতে। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সন্ত্রাসী ইসরায়েল সেই আশা বাদ দিয়েছে। তাদের এখনকার লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারকে ক্ষমতায় বসানো নয়, বরং সেখানে যাতে কোনো কার্যকর সরকারই না থাকে তা নিশ্চিত করা।
বৈরুতে আমার স্ক্রিনে এখন যে ম্যাপগুলো ভাসছে, তার ডিজাইন গাজার ম্যাপগুলোর মতোই। উচ্ছেদের ঘোষণাগুলো অস্পষ্ট এবং বিপজ্জনক। গাজায় যারা এই অস্পষ্ট সীমানা পার হয়েছিলো, তাদের হত্যা করা হয়েছিলো।
লেবাননের স্কুলগুলো এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। মানুষ সমুদ্রতীরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছে, যেখানে মাত্র দুই রাত আগে একটি তাঁবুতে বোমা ফেলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সন্ত্রাসী ইসরায়েল হুমকি দিয়েছে, লেবানন সরকার যদি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে তারা লেবাননের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতেও হামলা চালাবে। তারা চায় লেবাননের ভেতর গৃহবিবাদ বা ফাটল তৈরি হোক।
লেবানন কি গাজার মতো সহজ?
তবে মনে রাখতে হবে, লেবানন গাজা নয়। হামাস একটি অবরুদ্ধ সরু জায়গায় সাধারণ অস্ত্র নিয়ে লড়াই করেছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর কাছে আছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং কয়েক দশকের যুদ্ধপ্রস্তুতি। তারা বড় আঘাত সহ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে। দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলি স্থল অভিযান ইতোমধ্যেই তীব্র বাধার মুখে পড়েছে। ইরানও লেবাননের ভাগ্যকে যেকোনো যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছে।
সন্ত্রাসী ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন বা আদালতের তোয়াক্কা করছে না। তারা মনে করে, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অন্যায় করলে বিশ্ব একসময় তা মেনে নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যর্থতার দর্শক নয়, বরং তারা সন্ত্রাসী ইসরায়েলের সক্রিয় সহযোগী।
বর্তমানে লেবাননে যা ঘটছে তা আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বের অংশ। উচ্ছেদের নির্দেশগুলো আসলে এলাকাটি পুরোপুরি ধ্বংস করার পূর্বপ্রস্তুতি, যাতে মানুষ আর কোনোদিন ফিরতে না পারে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে কেবল যুদ্ধবিরতি চুক্তি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, দোষীদের বিচার এবং উচ্ছেদ হওয়া মানুষের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করা- তা গাজা থেকে বৈরুত পর্যন্ত যেখানেই হোক না কেন।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বিশ্ব সন্ত্রাসী নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যার’ অঙ্গীকার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতবিক্ষত পরগাছা ইসরায়েল
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
যে কারণে ইরান যুদ্ধের শেষ চাইছে মার্কিন জ্বালানি সচিব
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইরানে ধরা পড়লো ইসরায়েলি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক, গ্রেফতার ২০
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হরমুজ দখলে ড্রাম্পের ‘মিত্র জোট’ গঠনের ডাক, ফ্রান্সের সাফ ‘না’
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইরান যুদ্ধে স্থলসেনা মোতায়েন করছে সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্র
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সৌদিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৫ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত, বাগদাদ দূতাবাসে হামলা
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু না করার অনুরোধ হামাসের, মার্কিন কূটনীতিক ধরিয়ে দিলে পুরস্কার দেবে ইরানপন্থী গোষ্ঠী
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
কিলাওয়ার অগ্ন্যুৎপাত: বেড়েছে কম্পন, রেড অ্যালার্ট জারি
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
দখলদারদের সামরিক যান ধ্বংস করার পূর্বমুহুর্তে যোদ্ধাদের তোলা দৃশ্য।
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রকে জানালো ইসরায়েল
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইরানের শীর্ষ নেতাদের তথ্য দিলে কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
১৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












