সমতলেও ঘটছে চায়ের নীরব বিপ্লব। আধুনিকায়ন ও সিন্ডিকেটমুক্ত করলে সমতলের চা দিয়েই দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সরকারের উচিত সমতলের চা শিল্প নিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
, ২৫ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৪ হিজরী সন, ১৬ আউওয়াল, ১৩৯১ শামসী সন , ১৫ জুন, ২০২৩ খ্রি:, ০১ আষাঢ়, ১৪৩০ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মন্তব্য কলাম
এক সময়ে চায়ের রাজধানী মনে করা হতো সিলেটকে। কিন্তু কালক্রমে সেই চা-বাগান এখন আর সিলেটেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং পাহাড় ছেড়ে চা-বাগান এখন নেমে আসছে সমতলে। বাংলাদেশের আবহাওয়া চা চাষের জন্য খুবই সহায়ক, যা এখন আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। এদেশে উৎপাদিত চা গুণগত মানেও বিশ্বমানের। নতুন নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় চায়ের সম্ভাবনাও ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতরও হচ্ছে।
চা চাষাধীন জমির মধ্যে প্রায় ১৬% অতিবয়স্ক, অলাভজনক চা এলাকা রয়েছে যার হেক্টরপ্রতি বার্ষিক গড় উৎপাদন মাত্র ৪৮২ কেজি। এর বিপরীতে সমতলে চা উৎপাদন হচ্ছে। শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গে সমতলের চা বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান থেকে রেকর্ড পরিমাণ ১০.৩০ মিলিয়ন কেজি চা জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে।
চা চাষের সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে উত্তরের জেলাগুলোতে। এ অঞ্চলের মাটি উন্নতমানের চা উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। এখানে চা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বান্দরবানের রুমায় চা চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পঞ্চগড়ের অর্গানিক চা তো বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ে সীমিত পরিসরে চা চাষ হচ্ছে। লালমনিরহাট, নীলফামারীতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রামের হালদা ভ্যালির পরিত্যক্ত স্থানে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে চা চাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। ২০১৮ সালে ৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে এখান থেকে। এখানকার ‘গ্রিন টি’ চীনে রপ্তানি হচ্ছে। এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনায় বাগান মালিকেরাও পুরনো চারা উঠিয়ে নতুন চারা আবাদ করছে। পরিত্যক্ত জমিতেও চা চাষে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। পরিত্যক্ত থাকা ভূমি চট্টগ্রামের হালদা ভ্যালিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে চা উৎপাদনে আশাতীত সাফল্য পাওয়া গেছে।
তবে উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন বৈশ্বিক গড়ের নিচে। ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়া দেশগুলোর মধ্যে হেক্টরপ্রতি আড়াই হাজার কেজির কাছাকাছি উৎপাদন করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আবহাওয়া চা উৎপাদনের অনুকূলে থাকলেও এখানে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম। ফলে অন্য দেশের চেয়ে উৎপাদন কম হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ চা আমদানি করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। অথচ আবহাওয়ার ভিত্তিতে অন্যান্য দেশের চাইতে বাংলাদেশের চায়ের উৎপাদন অনেক দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তা হচ্ছে না।
কারণ হলো- উপযুক্ত তৎপরতা, নজরদারি কিংবা জাতীয় চা উৎপাদনে সমতলের অবদান বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার দুর্বলতা ও অবহেলা। চা-শিল্পকে দেশের শিল্প না বলে অনেকে আভিজাত্যের শিল্প বলে থাকে। কারণ গুটিকয়েক মালিকের হাতে জিম্মি এ শিল্প। এ শিল্প দেখিয়ে তাদের অনেকে বেশ সুযোগ-সুবিধা নেয় দেশ-বিদেশ থেকে। কিন্তু চা-কেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা নিলেও অনেকে চায়ের উন্নয়নে কাজে লাগায় না। এই সিন্ডিকেটের কারণে দেশের সমতলে চা শিল্পের উন্নয়ন হয়না। চা শিল্প বিনিয়োগের অভাবে তীব্র আর্থিক সংকটের সম্মুখীন। বিদ্যমান ব্যাংক ঋণের সুদের হার এত বেশি যে, বিনিয়োগের জন্য ঋণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা উৎপাদনকারীদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চা বাগানের উৎপাদকরা উৎপাদন চালু রাখতে পারলেও হঠাৎ উঠে আসা সমতলের চা বাগানের উৎপাদকরা টিকতে পারছে না। ফলে আশানুরুপ উৎপাদন হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশের চা শিল্পের উন্নয়নের জন্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও উৎপাদন বৈচিত্র্য আনতে হবে। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য বৃহদায়তনের বাগানের পাশাপাশি ক্ষুদ্রায়তনের জমিতে চায়ের আবাদ বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে, সমতলের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলের মধুপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার মোট ১ লাখ ১ হাজার ৭২৪ হেক্টর ক্ষুদ্রায়তনে চাষযোগ্য জমি রয়েছে। তার সাথে বাংলাদেশে বৃহদায়তনের চা বাগানগুলোর আওতায় মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে চায়ের আবাদ হচ্ছে মাত্র ৫৭ হাজার ১৮৬ হেক্টরে। চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাগানগুলোর সর্বোচ্চ কার্যকারিতাও বাড়াতে হবে এবং আবাদকৃত ভূমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। সমতলের চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবহন সমস্যা ও সংরক্ষণের সমস্যার সমাধান করতে হবে। সমতলের জন্য উপযোগী উন্নত চায়ের বীজের সংমিশ্রন ঘটাতে হবে। সমতলের উৎপাদন বাড়াতে ব্যাংক থেকে সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমতলের চা শিল্প শ্রমিকদের উন্নয়নেও নানা কমর্সূচি নিতে হবে। বিশেষভাবে সমতলের চা উৎপাদন নিয়ে গবেষণার পরিমাণ বাড়াতে হবে। চায়ের উৎপাদন ও সেচে আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের কার্যকারিতা ও বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
আর এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু নবম নয় বরং চা উৎপাদন ও রফতানিতে বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারবে। তাই সরকারের উচিত হবে, অত্যাধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির সন্নিবেশ ঘটিয়ে পাহাড়-সমতলের সমন্বয়ে দেশের চা খাতকে দেশের প্রধান প্রধান অর্থকরী খাতগুলোর আওতায় নিয়ে আসা।
-মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রয়োজন শরয়ী সর্বোচ্চ শাস্তি
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা।
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-১)
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অন্তর্জালে আম্রিকার সাথে বাংলাদেশের গোপন সমঝোতা- নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনা।
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রয়োজনীয় ৫০ লক্ষাধিক সদস্য সম্পন্ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ন্যানোটেকনোলজির কৌশলগত উপযোগিতা (পর্ব-১০)
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুসলমানদের সাথে রাশিয়ার মুনাফেকী নূতনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের জাগরণ দরকার।
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-২)
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নওমুসলিমদের আইনি সুরক্ষা ও তথাকথিত ‘ডিটেনশন সেল’ উচ্ছেদের দাবি
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক সেনাবাহিনীর জন্য বাংলাদেশের বাংকার নেটওয়ার্কের রূপরেখা (পর্ব ৯)
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পোর্কোন্নয়ন কেন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে? অনন্য উচ্চতায় উঠা এ সম্পর্ক কেন ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে উজ্জীবিত হবে না? (১ম পর্ব)
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও কৌশলগত স্বনির্ভরতা: বাংলাদেশের ৫০ লক্ষ পদাতিক বাহিনীর জন্য ৩য় প্রজন্মের এটিজিএম রোডম্যাপ (পর্ব ৭)
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিশ্বে তৈরী পোশাক রফতানীতে প্রথম বাংলাদেশ কেনো তুলা আমদানীতেও প্রথম? নামে তুলা উন্নয়ন বোর্ড থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তুলা চাষে কোনো উন্নয়নই নেই অপার সম্ভাবনা থাকলেও দেশে তুলা উৎপাদনে সরকারী কোনো তৎপরতা নেই অথচ ১৬৫০ থেকে ১৭৫০-এই ১০০ বছরে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোই বাংলা থেকেই ৩ লাখ গজ থেকে ৩ কোটি গজ কাপড় রপ্তানি করেছে। এই বিপুল উৎপাদনে এই বাংলাদেশই কীভাবে তুলার যোগান দিল?
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












