বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে শৃঙ্খল চিকিৎসা কাঠামো থাকলেও কাজে লাগাতে পারছেনা বাংলাদেশ। চিকিৎসা খাত হচ্ছে বাণিজ্যিকীকরণ, হারাচ্ছে মান। স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে জনগণের। ফলস্বরূপ চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমনের হার বাড়ছে। দেশ থেকে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। উন্নত চিকিৎসা খাত রাখা কি সরকারের সাংবিধানিক কর্তব্যের বাইরে?
, ০১ জুমাদাল উলা শরীফ, ১৪৪৫ হিজরী সন, ১৮ সাদিস ১৩৯১ শামসী সন , ১৬ নভেম্বর, ২০২৩ খ্রি:, ৩১ কার্তিক, ১৪৩০ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মন্তব্য কলাম
বলাবাহুল্য, মন্ত্রী এর কারণ খুঁজে না পেলেও সাধারণ মানুষ তা ঠিকই জানে। তা হলো দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। ন্যূনতম সেবা তো দূরের কথা চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ‘খদ্দের’ মনে করে দেশের চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকেরা রোগীদের সময় দেয় না। কথা বলার আগেই ব্যবস্থাপত্র লেখা শেষ। এ অবস্থায় মানুষ তো বিদেশে যাবেই।
দেশের চিকিৎসকদের বেশির ভাগই ওষুধ কোম্পানির হুকুম তালিমের ভূমিকা পালন করছে। রোগীদের কাছ থেকে বড় অংশের ফি নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না। ওষুধ কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার নামে তাদের কাছ থেকেও গ্রহণ করছেন বড় অঙ্কের টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের অলিখিত চুক্তি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা কমিশনের লোভে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার নেই সেসব বিষয়ে পরীক্ষার জন্যও রোগীদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক থাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো যেনতেনভাবে রিপোর্ট দিয়েই খালাস। বাংলাদেশের এসব পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এমনকি ভারতে গেলে সে দেশের চিকিৎসকরা হাসাহাসি শুরু করে।
অথচ এই চিকিৎসকদের পেছনেই জাতীয় বাজেটে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। যারা সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনা করছে সাধারণ মানুষের করের টাকায় তাদের পড়াশোনার ৯৫ শতাংশই অর্থের জোগান দেওয়া হয়।
গত ৫০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে যত ওপরে যাওয়া যায় সর্বত্রই একই দৃশ্য প্রতীয়মান হয়। অধিকাংশ হাসপাতালে এখনো পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নেই। কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতি আছে তো টেকনিশিয়ান নেই। বহির্বিভাগে একজন কনসালট্যান্টের চিকিৎসা ও কিছু ওষুধ পাওয়া ছাড়া তেমন সেবা মিলছে না। আবার মাত্রাতিরিক্ত খরচ দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গেলেও অযাচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ত্রুটিপূর্ণ ফল এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম সময় দেওয়ায় রোগীরা হতাশ হয়।
স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও চরম ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটের মাত্র ৬% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা পাশ্ববর্তী দেশগুলোর চাইতেও কম। এমনকি নেপালের চাইতেও কম। আবার বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোট যে ব্যয় হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে নাগরিকদের নিজের পকেট থেকে। এটা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক দশকের ব্যবধানে স্বাস্থ্য ব্যয়ে ব্যক্তি খরচ দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের চিকিৎসা খাতের এমন বেহাল অবস্থার দরুন চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের বিদেশ গমনের হার প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। প্রতি বছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। শুধু গত বছর যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে গেছে, তাদের শুধু চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই যায় ভারতে। ভারতে মেডিকেল ট্যুরিজমের ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। গত তিন বছরে মেডিকেল ট্যুরিজমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮৩%। চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা মূলত ভারতের কলকাতা, নয়াদিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে বেশি যাচ্ছে। থাইল্যান্ডে কয়েকটি হাসপাতালের ঢাকা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে অন্তত ৩ হাজার রোগী যায় বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে। পছন্দের তালিকায় এরপর আছে ব্যাংকক ও ভেজথানি হাসপাতাল। প্রতিবছর প্রায় সোয়া লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে যায় দেশটিতে।
এদিকে, দেশের শীর্ষ পদে আসীন কিছু ব্যক্তি, আমলা, রাজনীতিবিদ সভা-সেমিনারে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সাফল্যের ফুলঝুরি ছুড়লেও মূলত তারাও দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মোটেও আস্থাশীল নয়। শীর্ষ পদে আসীন এসব ব্যক্তিরা প্রতি বছর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দাঁত, চোখ ও কানের চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশে গিয়ে জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ যেভাবে অপব্যয় করে চলেছে তা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। এরা নিজ দেশে চিকিৎসা গ্রহণ না করে উদাহরণ সৃষ্টি না করায় অপরাপর ব্যক্তিরা এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মানের ঘাটতি রয়েছে এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার যে কাঠামো তা বিশ্বসেরা। বিশ্বের খুব কম দেশেই এরকম চিকিৎসা কাঠামো রয়েছে। দেশের রাষ্ট্র খাতের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রত্যন্ত ইউনিয়ন অবধি বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অন্যূন একটি হাসপাতাল রয়েছে। রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একাধিক বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। হিসেব করলে, দেশে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ৩২টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ১৮টি বিশেষায়িত চিকিৎসা ইনস্টিটিউট, ৬৪ জেলায় জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা, ইউনিয়নে ছোট-বড় ৪ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিদ্যমান। কিন্তু এ বিস্তৃত কাঠামোকে ব্যবহার করতে পারছেনা সরকার। অথচ এই কাঠামোকে যদি সক্রিয় এবং শক্তিশালী করা যায় তাহলে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার উদাহরণ হবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ থেকে নয় বরং বিদেশ থেকে মানুষ আসবে বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে।
তাই সরকারের উচিত, দেশে চিকিৎসা খাতের বেহাল অবস্থা দূরীকরণে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। চিকিৎসাকে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রক্ষা করা। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো জনবান্ধব করা, দুর্নীতি অনিয়ম দূর করা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রন করা। চিকিৎসকদের চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করা। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। বাজেটের ১৫% শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা। নাগরিকদের সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা। শুধু স্বাস্থ্য বরাদ্দ বৃদ্ধিই করলে চলবে না; সেই বরাদ্দ সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে কিনা, জনগনের পেছনে ব্যয় হচ্ছে তার জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য মনিটরিং সেল গঠন করা।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে ভারতীয় খপ্পরে বাংলাদেশ!
২৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নদীভাঙনে গত এক দশকে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ, নদী ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সরকার থেকে খাস বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হলেও প্রভাবশালী দখলদারদের দাপটে ভূমির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভূমিহীনরা।
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সক্ষমতা তৈরির জন্য সর্বোচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন ও যথেষ্ট সংখ্যক আমলা, কূটনৈতিক তৈরি ও প্রয়োগ করতে হবে।
২৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
“আঃলীগ আবার ক্ষমতায় আসলে কি করবে তার পরিকল্পনা ফাঁস আঃলীগ ক্ষমতায় আসলে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে ভারতের সেনাবিাহিনীকে দেশ রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হবে।”
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক জোরদার হওয়া উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মার্কিনীরা তাদের পতিত সরকারকেই নূতন করে তুলে ধরে অপেক্ষাকৃত বেশি লুটতরাজের শর্তে। নূতন করে মার্কিন গোয়েন্দাদের আনা-গোনা কি তারই আলামত!
২০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
এমপিদের জন্য ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের আইনী ও ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা অনেক।
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সংসদে সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন এমনকী জানালার পর্দা চাইলো জামায়াত এমপি বিরোধী এমপিদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা, স্পিকার বললেন ‘আমি কোনোদিন কানাকড়িও পাইনি’ সংসদ সদস্যরা ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পাবেন এমপিদের জন্য ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের আইনী ও ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা অনেক। এমপিদের জন্য বরাদ্দ প্রদান সংবিধান পরিপন্থী সংসদে বসে সাংসদরাই সংবিধান বিরোধী কাজ এবং নিজস্ব ভোগ বিলাসে তথা লুটতরাজে মত্ত (২য় পর্ব)
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সংসদ সদস্যরা ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পাবেন এমপিদের জন্য ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের আইনী ও ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা অনেক।।
১৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার প্রধান কারণ ‘মাফিয়া তান্ত্রিক’ সিন্ডিকেট ব্যবস্থা।
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারত বাংলাদেশ চুক্তিকে তারা গোলামীর চুক্তি বলে কঠিন আওয়াজ তুলেছিলো! আজ আমেরিকার প্রকাশ্য গোলামী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তারা নীরব কেনো? দেশ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধীরাও নিস্ক্রিয় থেকে কঠিন বৈষম্য করছে।
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












