সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার ঈমানদীপ্ত ঐতিহ্য (১৮)
, ০১ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৫ হিজরী সন, ১৩ আশির, ১৩৯১ শামসী সন , ১২ মার্চ, ২০২৪ খ্রি:, ২৮ ফাল্গুন, ১৪৩০ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) মহিলাদের পাতা
হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্যতম ইমাম, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুর রবি’ ইমাম যাইনুল আবেদীন আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র আশূরা শরীফ-এ সংঘটিত কারবালার মর্মান্তিক ঘটনায় একমাত্র জীবিত পুরুষ ব্যক্তিত্ব। যাঁর মুবারক উসীলায় হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সিলসিলা আজও সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।
উনার সুমহান ব্যক্তিত্বের তেজোদীপ্ত প্রভাব সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে- একদা তৎকালীন খলীফা হজ্জ আদায়ের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা শরীফ-এ আগমন করে। তাওয়াফের পর যখন হাজরে আসওয়াদ চুম্বন দিতে যাবে তখন প্রচুর ভীড়ের কারণে কোনমতেই খলীফা হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলো না। বাধ্য হয়ে তখন খলীফা তার সঙ্গীয় সভাসদসহ মিম্বরে গিয়ে ভীড় কমার প্রতিক্ষায় রইলো।
ইতোমধ্যে পবিত্র সুন্নতী পোশাকে সুশোভিত হয়ে সেখানে আগমন করলেন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুর রবি’ ইমাম যাইনুল আবেদীন আলাইহিস সালাম তিনি। উনার জিসিম মুবারক থেকে তখন আতর গোলাপের সুগন্ধি ছড়িয়ে চারদিক মোহিত করে তুলছিল। পবিত্র চেহারা মুবারক ছিল সূর্যের চেয়ে দীপ্তমান। তিনি তাওয়াফ শেষ করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য সবেমাত্র অগ্রসর হলেন। আর এতেই সমস্ত লোক পথ ছেড়ে দিয়ে অত্যন্ত আদবের সাথে দাঁড়িয়ে গেল। তিনি অগ্রসর হয়ে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে স্বেচ্ছায় সরে না গেলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত লোক নিজ নিজ স্থানে অত্যন্ত বিনীতভাবে তা’যীম-তাকরীমের সাথে দাঁড়িয়ে রইলো এবং সকলেই পবিত্র আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সমুজ্জ্বল নক্ষত্রের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। সুবহানাল্লাহ!
এদিকে খলীফার সাথে যারা এসেছিল তারা এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করে হতবাক হয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন খলীফার নিকট জিজ্ঞেস করলো, কে এই বুযূর্গ? লোকজন তো আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপও করলো না। অথচ আপনিই হলেন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন! অথচ উনাকেই সব সম্মান প্রদর্শন করা হলো। খলীফার নিকট এমন প্রশ্ন তার শাহী মর্যাদায় মারাত্মক আঘাত হানলো। তাই সে স্বীয় অপমানকে আড়াল করার জন্য ঈর্ষান্বিত হয়ে বলে উঠলো- আমিও তো অবগত নই যে, এই বুযূর্গ আসলেই কে? খলীফার সভাকবি ফরযদক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। খলীফার এমন অবজ্ঞাভরা বেয়াদবীমূলক উক্তি শুনে উনার ঈমানী জোশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। তিনি তৎক্ষনাৎ বলে উঠলেন- হে খলীফা! আপনি কি সত্যিই উনার পরিচয় জানেন না? তাহলে শুনুন আমার থেকে উনার সুমহান সত্তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা; এই বলে ফরযদক বলতে থাকলেন-
-“তিনি হলেন, হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার নয়নের আলো, উনার সম্মানিত নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপরই নুবুওয়াতের ক্রমধারা সমাপ্ত হয়েছে।
-তিনি ঐ ব্যক্তি যাঁকে দেখে মক্কাবাসী একবাক্যে বলে উঠে দান-ছদকা এবং প্রশংসনীয় মর্যাদা-মর্তবা উনার উপর এসে সমাপ্ত হয়েছে।
-তিনি এমন ব্যক্তিত্ব যে, উনার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবীদের নবী, রসূলদের রসূল এবং উনার উম্মতই সকল উম্মতের চেয়ে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন। তুমিও সেই উম্মতের একজন।
-এটাও অসম্ভব নয় যে, তিনি যখন হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য অগ্রসর হন, তখন হাজরে আসওয়াদই উনার সাথে আলিঙ্গন করতে ব্যাকুলচিত্তে এগিয়ে আসবে। ” এভাবে আরো অনেক প্রশংসা, ছানা-ছিফত ফরযদক নির্ভীকচিত্তে ব্যক্ত করলেন। রাগে ক্ষোভে খলীফার শরীর ঘর্মাক্ত হয়ে উঠল। সে সাথে সাথে নির্দেশ দিল- ফরযদককে পবিত্র মক্কা ও মদীনা শরীফ- এর মধ্যবর্তী আসফান নামক স্থানে নজরবন্দী করে রাখা হোক।
আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি ফরযদকের এমন ঈমানদীপ্ত মুহব্বত- ইশ্কের অবিচলতার কথা শুনে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুর রবি’ আলাইহিস সালাম তিনি খুবই সন্তুষ্ট হলেন। সাথে সাথে উনার বন্দীদশার কথা শুনে মর্মাহত হলেন। তিনি ফরযদকের মনের সান্তনার জন্য ১২ হাজার দিরহামসহ এই সংবাদ প্রেরণ করলেন যে, হে আবু কাবাশা! এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি থাকলে অবশ্যই আমি তোমাকে দিতাম। ফরযদক সে টাকা বিনীতভাবে ফিরিয়ে দিয়ে এই আরজ করলেন- হে আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সমুজ্জ্বল নক্ষত্র! আমি তো দুনিয়াবী লোভ-লালসা ও মর্যাদা পাওয়ার আশায় এ কাজ করিনি। বরং অদ্যাবধি শাসকদের অনর্থক মিথ্যা প্রশংসা করে নিজের পাপের পাল্লা ভারী করেছি। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। মহান আল্লাহ পাক তিনি যেন এ উসীলায় হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সাথে আমাকে নিছবত দান করে দোজাহানে কামিয়াবী দান করেন- এটাই একমাত্র চাওয়া পাওয়া।
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুর রবি’ আলাইহিস সালাম তিনি ফরযদকের ফরিয়াদ শুনে আবারো সেই অর্থ পাঠিয়ে ইরশাদ মুবারক করলেন- হে আবু কাবাশা! তুমি যদি সত্যিকার অর্থেই আমাদেরকে মুহব্বত করো, তবে এটা গ্রহণ করো। কেননা এটাও আমি একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির জন্য আমার নিজস্ব সম্পদ থেকেই তোমাকে হাদিয়া করেছি। অতঃপর কবি ফরযদক তা বিনাবাক্যে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেন। সুবহানাল্লাহ!
ঈমানদীপ্ত ইবরত:
সত্যিই দুনিয়াবী রাজা-বাদশাহদের সাথে পবিত্র আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের কী করে তুলনা হতে পারে? আলোচ্য ঘটনায় হজ্জে উপস্থিত হাজার হাজার মুসলমান আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সমুজ্জল রতœ সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুর রবি’ আলাইহিস সালাম উনার প্রতি ঈমানদীপ্ত তা’যীম তাকরীম প্রদর্শন করে সেটারই প্রমাণ দিলেন। সাথে সাথে খলীফার শাহী ব্যক্তিত্বের মুখে চপেটাঘাত করে কবি ফরযদক আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের অনন্য মর্যাদাকে দীপ্ত কন্ঠে তুলে ধরলেন। খলীফার রক্তচক্ষুকে মোটেও পরোয়া করলেন না। এভাবে যুগে যুগে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সুমহান মর্যাদাকে সমুন্নত রাখেন।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মুসলিম উম্মাহ উনার সুযোগ্য আওলাদ হযরত মুজাদ্দিদে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার তাজদীদী ঝা-ার উসীলায় নিজেদের ঈমান আমলকে রক্ষা করতে পারছে। তবে নিজেদের ঈমান আমলকে আরো শানিত ও মজবুত করে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রেযামন্দী সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে দুনিয়াবী আমীর-উমরাহ, রাজা-বাদশাহদের নিকট উনার সুমহান শান ব্যক্তিত্বকে এবং তাজদীদকেও নির্ভীকচিত্তে তুলে ধরতে হবে। যেমনটি করেছিলেন কবি ফরযদক রহমতুল্লাহি আলাইহি।
-মুহম্মদ মুহাজিরুল ইসলাম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা বেমেছাল ফযীলত মুবারকের অধিকারী
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সর্বক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রাধান্য দিতে হবে
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সর্বক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রাধান্য দিতে হবে
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মহিলাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার বিশেষ নির্দেশনা মুবারক- পর্দা পালন করা
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার নছীহত মুবারক: মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির সমস্ত কামিয়াবীর সোপান (১ম পর্ব)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ক্বলবী যিকির জারী না থাকলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মহিলাদের জামায়াতের জন্য মসজিদে ও ঈদগাহে যাওয়া হারাম ও কুফরী (৪)
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ইখলাছ অর্জন করা ফরজ; ইখলাছ ছাড়া ইবাদত-বন্দেগী কবুল হয় না
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা কাট্টা কুফরী
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মহিলাদের জন্য হাত, পা ও চেহারা আবৃত করে ঘর থেকে বের হওয়া ফরজ। খোলা রেখে বের হওয়া হারাম, জায়েয বলা কুফরী (৩)
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি পশু-পাখিদের মহব্বত ও সম্মান প্রদর্শনের কিছু নমুনা (১)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












