 |
পুঁজিবাজারে এইমস নিয়ে একের পর এক গুজব ॥ ফায়দা লুটে নিচ্ছে জুয়াড়ি চক্র
এনএনবি
| সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে পুঁজিবাজারে জুয়াড়ি চক্রের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এসব চক্রের গুজবের উপর ভর করে গত দুই বছরে এ মিউচ্যুয়াল ফান্ড কিনে বড় ধরনের লোকসান গুনেছেন অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী। সর্বশেষ এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়ার পরও অব্যাহত আছে জুয়াড়ি চক্রের তৎপরতা। ছেড়ে দেয়া হচ্ছে একের পর এক গুজব। এসব গুজবের করুণ পরিণতি শেষ কোন হতভাগা বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপবে সেই প্রশ্নই এখন পুঁজিবাজারে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এইমস নিয়ে বাজারে এখন তিনটি পৃথক গুজব বিদ্যমান আছে। এক নম্বর গুজব হচ্ছে, ৩০০ শতাংশ বা তারও বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে চলেছে কোম্পানিটি। দুই, বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন একসাথে করায় এসইসি তা নাকচ করেছে। নতুন করে শুধুমাত্র বোনাস শেয়ার প্রদানের আবেদন করা হতে পারে। সেটি করা হলে এসইসি অনুমোদন দেবে এমন আভাস নাকি পাওয়া গেছে। তিন নম্বর গুজব হচ্ছে, এইমস টু মিউচুয়্যাল ফান্ড নামে বাজারে নতুন একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড এই কোম্পানির মালিকরা ছাড়তে যাচ্ছেন। এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটধারীরা এইমস টু'র ইউনিটের মালিক হতে পারবেন। এর মাধ্যমে এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে পুরোপুরি অবলুপ্ত করার হাত থেকে রা করা হবে, এমন গুজব ছড়াচ্ছে জুয়াড়িরা। তাদের এসব গুজবের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেউ কেউ এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে সপ্তার শেষ দুদিনে এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির দর বেড়েছে। ১ টাকা অভিহিত মূল্যের মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১৬ টাকা ২০ পয়সায় যা আগের দিনের তুলনায় ১৭ পয়সা বেশি। এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ফান্ডটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউয়ার সাইদ বলেন, ডিভিডেন্ডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে ফান্ডের ট্রাস্টি বোর্ড। ট্রাস্টি বোর্ডের বৈঠকের পরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানা যাবে। এইমস টু মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এখন বাজারে যা শোনা যাচ্ছে তা সবই গুজব। এ সব গুজবের কোন ভিত্তি নেই। অবশ্য, এসব গুজবের সঙ্গে এইমসর লোকজনও জড়িত আছে, একথা তিনি অস্বীকার করেন। তবে লভ্যাংশ যাই দেয়া হোক এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের নতুন করে দর বাড়ার কোন কারণ দেখছেন না বাজার বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহাম্মেদ বলেন, এখন যা শোনা যাচ্ছে তা আসলে গুজব। তারপরও যদি ৩০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়, সে ক্ষেত্রে এই শেয়ার হোল্ডাররা পাবেন মাত্র ৩ টাকা। সুতরাং এ মিউচ্যুয়াল ফান্ড ১৬ টাকা দরে কেনার কোন যুক্তি নেই। তিনি আরও বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির ইউনিট প্রতি সম্পদ মূল্য মাত্র ৫ টাকা ১৯ পয়সা। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বাজার দর তার ইউনিটপ্রতি সম্পদ মূল্যের কাছাকাছি হওয়া উচিত। ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার পরই বড় ধরনের দর পতনের মতো ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এইমস ফার্স্টের ইউনিট হোল্ডারদের এইমস টু'র মালিক হওয়ার গুজবকে পাগলের প্রলাপ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, এসইসির ঘোষণা অনুযায়ী ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে ক্লোজ করতে হবে। উল্লেখ্য, এ মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে খেলা শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছর ২৭ সেপেম্বর ফান্ডটির ট্রাস্টি কমিটি ২০০৬-০৭ সালের জন্য ১০ শতাংশ নগদ এবং ২০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) পাঠায়। এসময় এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। দফায় দফায় বাড়তে থাকে ফান্ডটির ইউনিটের দর। এক পর্যায়ে এ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতিটি ইউনিটের মূল্য দাঁড়ায় ৩০ টাকা। পরবর্তীতে এসইসি এইমসের আবেদন নাকচ করে দেয় এবং মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বোনাস বা রাইট শেয়ার ইস্যুর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ সিদ্ধান্তের ফলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির বড় ধরনের দর পতন ঘটে। কয়েক দিনের মধ্যে ৩০ টাকা থেকে ৮ টাকায় নেমে আসে মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির ইউনিটের দর। অনেক বিনিয়োগকারীই নিঃস্ব হন এসময়। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা এসইসির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করে। এর পর এ মামলা নিয়ে নতুন খেলায় মেতে উঠে জুয়াড়ি চক্র। মামলার শুনানির সময় এলেই বাজারে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হত যে, বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যুর পক্ষে রায় দিতে চলেছে আদালত। ফলে বাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির দর বৃদ্ধি পেত। কিন্তু শুনানির পরেও আদালত কোন সিদ্ধান্ত না নেয়ায় কমে যেত দর। ফলে বেশি দরে এইমস কিনে প্রতিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হতো সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে মুনাফা লুটে নিত জুয়াড়ি চক্র। এ ভাবে দুই বছর চলার পর গত ৪ নভেম্বর আদালত রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা জারির আগে গঠিত মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো এসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে রাইট ও বোনাস শেয়ার দিতে পারবে। এ রায়ের ফলে মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে সব নাটকের অবসান হয়েছে বলে অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু এ সময় আবার নতুন খেলায় মেতে উঠে জুয়াড়ি চক্র। এ সময় রায় বিনিয়োগকারীদের পক্ষে গেছে এমন কথা প্রচার করে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দর বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু এর কয়েক দিন পরই এসইসির পক্ষ থেকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হতে পারে বলে বিভিন্ন ভাবে ইঙ্গিত দেয়া হয়। ফলে আবারও মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির দর পতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে গত ২৪ জানুয়ারি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করার সিদ্ধান্তের কথা জানায় এসইসি। প্রথমে আপিল করার কথা জানিয়ে পরবর্তীতে আপিল না করে পরোক্ষভাবে এসইসি জুয়াড়ি চক্রকেই সহায়তা করে বলে অভিযোগ উঠে। এদিকে সুযোগটিকে ভাল ভাবে কাজে লাগায় জুয়াড়ি চক্র। তারা প্রচার করতে থাকে এইমস বড় ধরনের বোনাস শেয়ার ও রাইট শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দিতে চলেছে। সত্যি সত্যিই ফান্ডটির ট্রাস্টি কমিটির সভায় ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের ৭০ শতাংশ হারে বোনাস শেয়ার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সঙ্গে ফান্ডের আকার বৃদ্ধির জন্য ১৩০ শতাংশ হারে রাইট শেয়ার ইস্যুরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য এসইসিতে পাঠানো হয়। এইমসর বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদনের ঘোষণার পর পরই এই প্রতিষ্ঠানের লেনদেন স্থগিত করে এসইসি। পরবর্তীতে গত ৭ মার্চ এসইসি এইমসের বোনাস ও রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন নাকচ করে লেনদেন শুরুর নির্দেশ দেয়। বাজার বিশে−ষকদের মতে, এই মিউচ্যুয়াল ফান্ডটির সবচে বড় নেগেটিভ দিক হলো আগামী বছরের মধ্যেই এটি ক্লোজ করে দিতে হবে। এটি এখনই যদি ক্লোজ করা হয়, কোম্পানির হিসাব মতেই এর শেয়ারহোল্ডাররা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে পাবে মাত্র ৫ টাকা ১৯ পয়সা। এ থেকে যদি চলতি অর্থ বছরে ৩০০ ভাগ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হয়ই, সেক্ষেত্রে এই লভ্যাংশের অধিকাংশটাই রিজার্ভ ফান্ড থেকে দিতে হবে। কারণ, বাৎসরিক আয় এই ডিভিডেন্ডের তুলনায় নিতান্তই কম। এতে দেখা যাবে, প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে নীট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ টাকায় নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ আগামী বছর যখন এই মিউচ্যুয়াল ফান্ড কে−াজ করা হবে, যাদের হাতে এই শেয়ার থাকবে তারা প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে পাবেন মাত্র ৩ টাকা করে। এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বিলুপ্ত না করে এইমস টু মিউচ্যুয়াল ফান্ডে রূপান্তরিত করার যে গুজব বাজারে রয়েছে, এটি বাস্তবায়িত হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, এসইস্থির পক্ষে সেই অবৈধ কাজে অনুমোদন দেয়া আদৌ সম্ভব হবে না। আরও চিনার বিষয় হচ্ছে, এসইসি যদি এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে অনুমোদন দেয়ও সেক্ষেত্রে দেখা যাবে এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের তাতে শেষ রক্ষা হচ্ছে না। যেহেতু এসইসি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভবিষ্যতে ১০০ টাকার নিচে কোন শেয়ারেরই ফেইসভ্যালু অনুমোদন করবে না। সেই পরিস্থিতিতে এইমস টুর প্রতিটি শেয়ার হাতে পেতে এইমস ফাস্ট'র্র বিনিয়োগকারীদের অন্তত ৩৩টি শেয়ারের প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে বাজার বিশে−ষকরা চরমভাবে আশংকিত, এইমস ফাস্ট র্মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের শেষ পরিণতি কী হয় এই ভেবে। |
|
 |