 |
সুতার দাম বৃদ্ধিতে তাঁতিরা বিপাকে
নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুত সঙ্কটের কথা বলে ব্যবসায়ীরা সুতার দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় দেশের তাঁতিরা বিপাকে পড়েছেন। তাঁত-প্রধান এলাকা সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নরসিংদীর তাঁতিরা বলছেন, দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তাদের তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এ অবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। অন্যদিকে সুতা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু দামই তারা বাড়িয়েছেন। দাম বৃদ্ধির কথা বলে সুতা আমদানির সুযোগ তৈরির পথ খোঁজা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। দাম বৃদ্ধি নিয়ে শনিবার সুতা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর একটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ২৩ মার্চ বৈঠকের নতুন দিন ঠিক হয়েছে বলে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব এমদাদুল হক। তিনি বলেন, "এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে আগামী ২৩ মাচের্র আগে কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।" দেশের সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ তাঁতি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ এবং পাবনায় আড়াই লাখ। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানাতেই তাঁতি পরিবার রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার। ওই এলাকার সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণীসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসও তাঁত ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগও করেছেন তিনি। তাঁত মালিকদের অভিযোগ, বর্তমানে প্রতি পাউন্ড সুতা বাজারে ১১০ টাকা থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ পাঁচ মাস আগে দাম ছিলো ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। তাঁত বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য আবু আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বাড়ার কারণে প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে সর্বোচ্চ সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত ব্যয় বাড়তে পারে। কারণ প্রতি পাউন্ডে সর্বোচ্চ ১১ থেকে ১৩ সেন্ট পর্যন্ত তুলার দাম বেড়েছে। কিন' সুতাকল ব্যবসায়ীরা এ অজুহাতে পাউন্ডপ্রতি দাম বাড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। যা মূল দামের প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির যুগ্ম-আহ্বায়ক বদিউজ্জামান বলেন, "গত বছরের অক্টোবর মাসে সুতাকল ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার বেনাপোল বন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই সুতার দাম নানা অজুহাতে বাড়তে থাকে। কয়েক দিন পরপরই ব্যবসায়ীরা পাউন্ডপ্রতি সাত থেকে আট টাকা করে দাম বাড়ায়।" "মাত্র পাঁচ মাসে সুতার দাম বেড়ে পাউন্ডপ্রতি ১১০ থেকে ১১৫ টাকা হয়েছে। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাঁতিদের নাভিঃশ্বাস উঠছে। ইতিমধ্যে অনেক তাঁত বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে", বলেন তিনি। তাঁতিরা বলছেন, এক মিটার কাপড় উৎপাদনে তাদের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। কিন' সেই তুলনায় তারা কাপড়ের দাম বাড়াতে পারছেন না। কিন' তাঁত শিল্প রক্ষায় তাদের অনেক বেশি দামে সুতা কিনে কারখানা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। সুতার দাম নিয়ন্ত্রণে বেনাপোল দিয়ে সুতা আমদানি উন্মুক্ত করে দিতে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তাঁতিরা। সুতাকল ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সুতাকলের গুদামে প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুতা অবিক্রিত অবস্থায় ছিলো। তাদের দাবির মুখেই সরকার বেনাপোল বন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ বর্তমানে থাইল্যান্ড, চীন, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, উজবেকিস্তান, প্যারাগুয়ে ও মিশর থেকে তুলা ও সুতা আমদানি করে। সুতার দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে সুতাকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি আব্দুল হাই সরকার বলেন, সুতার দাম বাড়ার সঙ্গে শুধু তুলার দাম বৃদ্ধিই কারণ নয়। এর সঙ্গে বিদ্যুত সরবরাহও অনেকটা নিভর্র করে। বর্তমানে প্রতি কেজি তুলায় দাম ৯৩ সেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সুতার দামও বাড়াতে হচ্ছে। সুতা আমদানির বিরোধিতা করে তিনি বলেন, "ভারত থেকে বেনাপোল হয়ে যারা সুতা আমদানির সঙ্গে জড়িত, দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে তারাই এ ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে।" "ব্যবসায়ীরা তাদের নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই মূল্য বাড়িয়েছে। তবে সুতা আমদানি আবার শুরু হলে দেশের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে", বলেন তিনি। লতিফ বিশ্বাস বলেছেন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীকে জানিয়েছি। তিনি গত ৯ মার্চ এক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করছি, শিগগিরই তিনি সুতাকল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন, তিনি জানান। |
|
 |